বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে সিলেট পৌঁছেছেন। গতকাল রাতে সিলেট পৌঁছেই তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। আজ বেলা ১১টায় সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন।
এর আগেও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওলি-আউলিয়ার পুণ্যভূমিখ্যাত সিলেটে মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে শুরু করতেন তাদের সময়কার ভোটের লড়াই। তবে কেবল পুণ্যভূমি হিসেবেই নয়, অর্থনীতির চালিকাশক্তি গ্যাসসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ সিলেট অঞ্চল।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এ এলাকার পর্যটন শিল্পও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া বড় মাপের জাতীয় নেতাদের জন্মস্থান হিসেবেও রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব আছে এ অঞ্চলের। আগামী দিনে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এ অঞ্চলের অর্থনীতি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে বিশেষ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা।
কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গোটা অর্থনীতির চালিকাশক্তি প্রাকৃতিক গ্যাস। এ গ্যাসের অন্যতম প্রধান উৎপত্তিস্থল সিলেট ও এ বিভাগের জেলাগুলো। দেশের উৎপাদিত গ্যাসের ৬০ শতাংশই আসে সিলেটের গ্যাসকূপগুলো থেকে। গ্যাস উত্তোলন আগামী দিনে আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গ্যাস ছাড়াও অন্যান্য প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ পুরো সিলেট জুড়ে ছড়িয়ে আছে। তেমনই একটি অপরিশোধিত তেল। যা প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে গ্যাসকূপ থেকে আহরণ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন। পাথর ও চুনাপাথরের জোগানও আসে এ অঞ্চল থেকে।
খনিজ সম্পদের পাশাপাশি রাজনীতিতেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সিলেট অঞ্চল। সেখান থেকে উঠে এসেছেন অনেক জাতীয় নেতা। তেমনই একজন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় রকমের সংস্কার এনেছিলেন তিনি। মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণকারী এ রাজনীতিবিদ নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে দেশের কর ও শুল্ক ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিয়েছিলেন। দেশে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) প্রচলন হয় তার হাত ধরে।
সম্প্রতি সিলেটের রাজনীতিতে আলোচনায় আছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হুমায়ুন কবির। এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন তিনি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন অবস্থানকালে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ জোরদারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন হুমায়ুন কবির। বর্তমানে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। আগামীতে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা যেতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে।
তারেক রহমানের সিলেট সফর ও সিলেট অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া ছাড়াও রাজনীতি ও অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে সিলেট। যদিও বিগত সময়ে এ অঞ্চল যতটুকু এগোনোর কথা ছিল সেটি হয়নি। আগামী দিনে বিএনপি সরকার গঠন করলে এ অঞ্চলের উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে। যেমন জ্বালানি খাতে মোট গ্যাসের ৬০ শতাংশ সিলেট থেকে উত্তোলন হয়। আরো গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা আছে।
সেটি কীভাবে করা যায় সে ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে কীভাবে সিলেটকে পর্যটন নগরীতে রূপান্তর করা যায় সে পরিকল্পনাও নিতে হবে। এছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়া হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতও অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে।’
হুমায়ুন কবির আরো বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিকল্পনা পুরো বাংলাদেশকে ঘিরে। সিলেটও এর অন্তর্ভুক্ত। বিদ্যমান খাতগুলোর সঙ্গে এখানকার আইসিটিসহ অন্যান্য খাত তারেক রহমানের নেতৃত্বে সামনের দিনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে বলে মনে করি।’
এদিকে গতকাল রাত ৮টার দিকে সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে তারেক রহমান রওনা হন হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের পথে। রাত ৯টা ২০ মিনিটে তিনি সেখানে পৌঁছান। মাজার জিয়ারত শেষে তিনি পাশের মাজার কবরস্থানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর কবর জিয়ারত করেন। পরে রাতে খাদিমনগরে হজরত শাহ পরাণের (র.) মাজার জিয়ারত করেন তিনি।
বিমানবন্দর থেকে মাজারে যাওয়ার পথে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানাতে সড়কের দুপাশে জড়ো হন হাজারো মানুষ। তারেক রহমানও বাসের ভেতর থেকে কর্মী-সমর্থকদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
দুই মাজার জিয়ারতের পর সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামে শ্বশুর প্রয়াত মাহবুব আলী খানের বাড়িতে যান তারেক রহমান। সেখানে কিছু সময় অবস্থানের পর শহরের ‘গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে’ গিয়ে রাতযাপন করেন। তারেক রহমানের সঙ্গে সিলেটে এসেছেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ একটি প্রতিনিধি দল।
এদিকে আজ থেকে শুরু হওয়া সফরের সূচির বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানান, তারেক রহমান রাতে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন এবং আগামীকাল (আজ) সকালে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দেবেন। দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুর আইনপুর খেলার মাঠে সমাবেশে যোগ দেবেন।
যাত্রাপথে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদ মাঠে সমাবেশে বক্তব্য দেবেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া ফুটবল মাঠে ও বিকালে কিশোরগঞ্জের ভৈরব স্টেডিয়ামে নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দেবেন। যাত্রাপথে নরসিংদী পৌর পার্কসংলগ্ন স্থানে ও পরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়া এলাকায় সমাবেশে যোগ দিয়ে গভীর রাতে গুলশানের নিজ বাসভবনে ফিরবেন।
সিলেট থেকে শুরু হওয়া বিএনপির এ নির্বাচনী প্রচারণা দেশব্যাপী চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। সিলেটের পরপরই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, বরিশাল, যশোরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চল সফরে যাবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক:- গজনবী বিপ্লব
নেত্রকোণা অফিস:- গজনবী ভিলা, সাতবেরিকান্দা, নেত্রকোণা সদর, নেত্রকোণা