ঢাকা ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামলায় জখম নারীর অভিযোগ না নিয়ে ঘটনা সালিশে সমাধানের পরামর্শ দেন ওসি

ছবি মুক্তা বেগম

নেত্রকোনার বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চম্পক দামের বিরুদ্ধে মারধরে জখম হওয়া এক নারীর থঅভিযোগ না নিয়ে সালিশে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ওসি চম্পক দাম লিখিত অভিযোগ না নিয়ে বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও দুই পক্ষকে থানায় ডেকে আলোচনা করেই শেষ করা হবে জানান ওসি। গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে বারহাট্টা থানায় এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগীরা হলেন, উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের আলোকদিয়া গ্রামের আব্দুল্লাহর স্ত্রী মুক্তা বেগম (৪৫) ও তাঁর মেয়ে আঁখি আক্তার (২৮)। হামলাকারী বাদশা মিয়া (৩৬) এই ইউনিয়নের পাশ্ববর্তী ধনপুর গ্রামের মৃত নুর হাকিমের ছেলে। তিনি মৎস্য ব্যবসায়ী। অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার দুপুরে বারহাট্টা উপজেলার ধনপুর গ্রামে আঁখি আক্তারের স্বামী বাদশা মিয়া (৩৬) শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাঁকে মারধর করেন।

এ সময় মেয়েকে রক্ষা করতে গেলে বাদশা লাঠি দিয়ে শাশুড়ি মুক্তা বেগমের পিঠে আঘাত করলে তিনি রক্তাক্ত হন। এসময় তাকে কিল ঘুষি ও টেনে হিঁচড়ে আহত করা হয়। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে মা-মেয়েকে উদ্ধার করে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। রাত প্রায় ১০টার দিকে তাঁরা বারহাট্টা থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে যান। সেখানে গিয়ে অভিযুক্ত বাদশা মিয়াকে আগেই থানায় উপস্থিত দেখতে পান বলে দাবি করেন তাঁরা। মুক্তা বেগম বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ দিতে চাইলে ওসি প্রথমে তা গ্রহণ করেননি। আগামী বুধবার থানায় উভয় পক্ষকে ডেকে সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি। এসব বলে অভিযোগ না নিয়েই তিনি আমাদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

পরে আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে রাস্তা থেকে ফেরত গিয়ে অভিযোগ লিখে জমা দিয়ে আসি। আমাদের পরিচিত একজন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালে ওসি কিছুটা নমনীয় হয় এবং অভিযোগ নিতে রাজি হয়। হয়। অভিযোগ নেওয়ার পরও ওসি বলেন, এ বিষয়ে বুধবার থানায় আলোচনা হবে, এরপর প্রয়োজন হলে মামলা হবে। তিনি আরও বলেন, থানায় গিয়ে দেখি আগে থেকেই অভিযুক্ত বাদশা সেখানে অবস্থান করছে। পুলিশের সাথে তার বেশ সখ্য। তাই হয়তো আমাদের অভিযোগ নিতে চাইছে না পুলিশ। এত বড় জখমের পর কেন অভিযোগ নিতে চাইছে না বুঝতে পারছি না।

আমরা তো সালিশ চাই না। আর থানা তো সালিশের জায়গা না। একই অভিযোগ করেন অপর ভুক্তভোগী আঁখি আক্তার। তিনি বলেন, শেষমেশ অভিযোগ দিয়েও ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি। কারণ বদশার সাথে পুলিশের ভালো সম্পর্ক দেখলাম। আমাদেরকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে আগেই থানায় গিয়ে পুলিশের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। ওসি বাদশার বিরুদ্ধে অভিযোগ না নিয়ে উল্টো তার সাথে আলাপ করছিল। সালিশের সময় দিচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তমপক্ষের কাছে আমরা এর বিচার চাই। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ২০২৩ সালে আঁখি আক্তারের সঙ্গে বাদশা মিয়ার বিয়ে হয়।

বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন শুরু হয়। কয়েক লাখ টাকা দেওয়ার পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। এ ঘটনায় গত বছরের নভেম্বরে আঁখি আক্তার আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটি চলমান রয়েছে। তাঁদের এক বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। সম্প্রতি বাদশা মিয়া গোপনে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে দাম্পত্য বিরোধ আরও তীব্র হয় এবং আঁখি আক্তার সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন

গতকাল শনিবার দুপুরে বাড়িতে গিয়ে আঁখিকে মারধর শুরু করে বাদশা। এসময় মেয়েকে বাঁচাতে এলে মা মুক্তা বেগমকে লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করে রক্তাক্ত করেন বাদশা। এছাড়াও কিল ঘুষি মেরে টেনে হিঁচড়ে আহত করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বারহাট্টা থানার ওসি চম্পক দামের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে। এ বিষয়ে জানতে হামলাকারী বাদশা মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়। অভিযোগের বিষয়ে বারহাট্টা থানার ওসি চম্পক দাম বলেন, আভিযোগ নেওয়া হয়েছে। পারিবারিক বিষয় আলোচনা করে শেষ করে দিতে বলা হয়েছে। তবে জখমি মুক্তা বেগমের অভিযোগ নেওয়ার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

বিষয়টি অবহিত করলে জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, হামলায় জখমের ঘটনায় অভিযোগ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমন ঘটনায় থানায় সালিসের নিয়ম নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Gojnobi biplob

Popular Post

নেত্রকোণার মদনে পরীক্ষা কেন্দ্রে অবাধে নকলের অভিযোগ:

হামলায় জখম নারীর অভিযোগ না নিয়ে ঘটনা সালিশে সমাধানের পরামর্শ দেন ওসি

প্রকাশের সময় : ০৫:৫৫:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

ছবি মুক্তা বেগম

নেত্রকোনার বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চম্পক দামের বিরুদ্ধে মারধরে জখম হওয়া এক নারীর থঅভিযোগ না নিয়ে সালিশে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ওসি চম্পক দাম লিখিত অভিযোগ না নিয়ে বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও দুই পক্ষকে থানায় ডেকে আলোচনা করেই শেষ করা হবে জানান ওসি। গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে বারহাট্টা থানায় এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগীরা হলেন, উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের আলোকদিয়া গ্রামের আব্দুল্লাহর স্ত্রী মুক্তা বেগম (৪৫) ও তাঁর মেয়ে আঁখি আক্তার (২৮)। হামলাকারী বাদশা মিয়া (৩৬) এই ইউনিয়নের পাশ্ববর্তী ধনপুর গ্রামের মৃত নুর হাকিমের ছেলে। তিনি মৎস্য ব্যবসায়ী। অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার দুপুরে বারহাট্টা উপজেলার ধনপুর গ্রামে আঁখি আক্তারের স্বামী বাদশা মিয়া (৩৬) শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাঁকে মারধর করেন।

এ সময় মেয়েকে রক্ষা করতে গেলে বাদশা লাঠি দিয়ে শাশুড়ি মুক্তা বেগমের পিঠে আঘাত করলে তিনি রক্তাক্ত হন। এসময় তাকে কিল ঘুষি ও টেনে হিঁচড়ে আহত করা হয়। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে মা-মেয়েকে উদ্ধার করে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। রাত প্রায় ১০টার দিকে তাঁরা বারহাট্টা থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে যান। সেখানে গিয়ে অভিযুক্ত বাদশা মিয়াকে আগেই থানায় উপস্থিত দেখতে পান বলে দাবি করেন তাঁরা। মুক্তা বেগম বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ দিতে চাইলে ওসি প্রথমে তা গ্রহণ করেননি। আগামী বুধবার থানায় উভয় পক্ষকে ডেকে সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি। এসব বলে অভিযোগ না নিয়েই তিনি আমাদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

পরে আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে রাস্তা থেকে ফেরত গিয়ে অভিযোগ লিখে জমা দিয়ে আসি। আমাদের পরিচিত একজন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালে ওসি কিছুটা নমনীয় হয় এবং অভিযোগ নিতে রাজি হয়। হয়। অভিযোগ নেওয়ার পরও ওসি বলেন, এ বিষয়ে বুধবার থানায় আলোচনা হবে, এরপর প্রয়োজন হলে মামলা হবে। তিনি আরও বলেন, থানায় গিয়ে দেখি আগে থেকেই অভিযুক্ত বাদশা সেখানে অবস্থান করছে। পুলিশের সাথে তার বেশ সখ্য। তাই হয়তো আমাদের অভিযোগ নিতে চাইছে না পুলিশ। এত বড় জখমের পর কেন অভিযোগ নিতে চাইছে না বুঝতে পারছি না।

আমরা তো সালিশ চাই না। আর থানা তো সালিশের জায়গা না। একই অভিযোগ করেন অপর ভুক্তভোগী আঁখি আক্তার। তিনি বলেন, শেষমেশ অভিযোগ দিয়েও ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি। কারণ বদশার সাথে পুলিশের ভালো সম্পর্ক দেখলাম। আমাদেরকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে আগেই থানায় গিয়ে পুলিশের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। ওসি বাদশার বিরুদ্ধে অভিযোগ না নিয়ে উল্টো তার সাথে আলাপ করছিল। সালিশের সময় দিচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তমপক্ষের কাছে আমরা এর বিচার চাই। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ২০২৩ সালে আঁখি আক্তারের সঙ্গে বাদশা মিয়ার বিয়ে হয়।

বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন শুরু হয়। কয়েক লাখ টাকা দেওয়ার পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। এ ঘটনায় গত বছরের নভেম্বরে আঁখি আক্তার আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটি চলমান রয়েছে। তাঁদের এক বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। সম্প্রতি বাদশা মিয়া গোপনে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে দাম্পত্য বিরোধ আরও তীব্র হয় এবং আঁখি আক্তার সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন

গতকাল শনিবার দুপুরে বাড়িতে গিয়ে আঁখিকে মারধর শুরু করে বাদশা। এসময় মেয়েকে বাঁচাতে এলে মা মুক্তা বেগমকে লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করে রক্তাক্ত করেন বাদশা। এছাড়াও কিল ঘুষি মেরে টেনে হিঁচড়ে আহত করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বারহাট্টা থানার ওসি চম্পক দামের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে। এ বিষয়ে জানতে হামলাকারী বাদশা মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়। অভিযোগের বিষয়ে বারহাট্টা থানার ওসি চম্পক দাম বলেন, আভিযোগ নেওয়া হয়েছে। পারিবারিক বিষয় আলোচনা করে শেষ করে দিতে বলা হয়েছে। তবে জখমি মুক্তা বেগমের অভিযোগ নেওয়ার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

বিষয়টি অবহিত করলে জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, হামলায় জখমের ঘটনায় অভিযোগ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমন ঘটনায় থানায় সালিসের নিয়ম নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।