ঢাকা ০৬:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধদিনের গল্প–জাহাঙ্গীর খান

  • বেঙ্গল নিউজ ডেক্স
  • প্রকাশের সময় : ১১:১৪:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২২৬ বার পড়া হয়েছে
ছবি- সুবোধ
১#
বসন্তকাল,১৯৭১।
কিন্তু মানুষের ঘরে বসন্ত ছিলোনা!
ফাগুনের শেষে গ্রামের শিমুলগাছগুলো লাল হয়ে উঠেছিলো।
দূরের মাঠে বাতাস বইলে শুকনো ধানের খড় উড়ে যেতো।
সন্ধ্যার পর পুকুরের জলে কুয়াশা নামতো।
সবকিছু আগের মতোই ছিলো—শুধু মানুষের চোখগুলো বদলে গিয়েছিলো।
সেই চোখে তখন ঘুম ছিলোনা!
ছিলো ভয়!
ঢাকা থেকে খবর আসছিলো ;
খবরের সঙ্গে সঙ্গে আসছিলো গুজব।
রাতের অন্ধকারে নাকি শহর জ্বলছে!
মানুষকে ঘর থেকে বের করে হত্যা করা হচ্ছে!
রাস্তার পড়ে আছে সারি সারি লাশ!
কেউ বলতো,পাকবাহিনী আসছে!
কেউ বলতো, তারা ইতিমধ্যে পাশের থানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে!
গ্রামের মানুষ জানতো না কোন খবরটি সত্য, কোনটি গুজব।
কিন্তু ভয় সত্য ছিল!
ভয়কে প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।
গ্রামের নাম টেংগা।
বড় গ্রাম।
গ্রামের অধিবাসীদের অর্ধেকই হিন্দু।
হিন্দু-মুসলমানের বাড়ি পাশাপাশি।
একই বাজার, একই স্কুল, একই কাঁচা রাস্তা।
বর্ষায় কারও বাড়িতে নৌকা লাগতো, শীতকালে সবাই একই মাঠে ধান কাটতো।
ধর্ম আলাদা ছিল।
জীবন ছিল এক।
স্থানীয় হাইস্কুলে ইংরেজি পড়াতো সেই গ্রামের এক তরুণ।
তার ডাক নাম সিদ্দিক।
বয়স তেইশ কি চব্বিশ।
সদ্য ডিগ্রি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে।
ছেলেটি খুব বড় কোনো মানুষ ছিলোনা।
তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ও ছিলোনা।
মধ্যবিত্ত গেরস্থ ঘরের ছেলে।
এই পরিচয়ের বাইরে তার আর কোন পরিচয় নেই,কেবল একজন ভালো ছাত্র ছাড়া।
আর ছিলো শুধু একটি জিনিস—
সুনাম।
গ্রামে কেউ বলতে পারতো না, সিদ্দিক কারও সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
কেউ বলতে পারতো না, কারও পাওনা মেরে দিয়েছে।
কেউ বলতে পারতো না,
দুর্বল কাউকে ঠকিয়েছে।
তার বাবা প্রায়ই বলতেন,
—মানুষের ঘরে টাকা না থাকলেও চলে। কিন্তু মানুষের নামে দাগ থাকলে চলে না।
সিদ্দিক ছোটবেলায় কথাটা শুনতো।
বড় হতে হতে বুঝেছিলো—কিছু শিক্ষা বই থেকে আসে না।
২#
মার্চের শেষ সপ্তাহে সিদ্দিক সিদ্ধান্ত নিলো যুদ্ধে যাবে।ইতোমধ্যে নবম শ্রেণী পড়ুয়া তার দুই ভাগ্নে পালিয়ে যুদ্ধে চলে গেছে।সে পরের মাসে কাউকে না জানিয়ে চলে গেলো মহিষখোলা সীমান্তে।
সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটমেন্ট সেন্টারে।
সেখানে দায়িত্বরত ভারতীয় বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহান তার সবকিছু শুনে বললো,
তুমি ফিরে যাও,স্কুলে মাস্টারি করতে থাকো।পাকবাহিনী তোমার এলাকায় আসলে তুমি তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে তাদের কনভিন্স করবা,এলাকার মানুষ এবং মুক্তিবাহিনীকে প্রটেকশন দিবা।এইটাই তোমার কাজ।
সিদ্দিক ফিরে এলো তার স্কুলে।
৩#
শোনা যাচ্ছে পাকবাহিনী নেত্রকোণা পর্যন্ত চলে এসেছে!যেকোনো সময় তেলিগাতী বাজারে ক্যাম্প করবে!
আগস্টের শেষ সপ্তাহে গ্রামের হিন্দুপাড়ায় প্রথম আতঙ্ক নেমে এলো!
পাশের হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম থেকে কয়েকটি পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছে।
তাদের চোখে এমন এক ভয় ছিলো, যা দেখে গ্রামের মানুষ বুঝে গেল—খবরগুলো মিথ্যা নয়।
এক বৃদ্ধ লোক বলেছিলো,
—ঘর জ্বলতে দেখেছি।
আরেকজন বলেছিলো,
—মানুষকে মারতে দেখেছি।
তারপর তারা আর কথা বলতে পারেনি।
সেদিন রাতেই হিন্দুপাড়ার কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ্য মানুষ একটি বাড়িতে গোল হয়ে বসলো।
হারিকেনের আবছা আলোয় তাদের মুখগুলো হলদে হয়ে উঠেছিলো।
কেউ কথা বলছিলো না।
শেষ পর্যন্ত বয়োজ্যেষ্ঠ নরেন্দ্র কর বললেন,
—আমাদের চলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই!
কেউ প্রতিবাদ করল না।
কেবল একজন বৃদ্ধা বললেন,
—এই বয়সে কোথায় যাব?
তার ছেলে উত্তর দিল,
—মা, বেঁচে থাকলে আবার ফিরবো।
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন!
মানুষের জীবনে কিছু কথা আছে, যার উত্তর দেওয়া যায় না!
“আবার ফিরবো”—এই কথাটিও তেমন।
সিদ্ধান্ত হলো, তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাবে।
কিন্তু চলে যাওয়ার আগে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়াল।
জমিজমা কার কাছে রেখে যাবে?
এমন প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
একজন মানুষ নিজের ঘর বন্ধ করে চলে যেতে পারে। কিন্তু জমির দরজায় তালা দেওয়া যায় না।
ধানের জমি পড়ে থাকবে,
পুকুর থাকবে,
বাঁশঝাড় থাকবে,
বাড়ির ভিটা থাকবে।
আর মানুষের লোভও থাকবে।
প্রথমে গ্রামের কয়েকজন ধনী মানুষের নাম উঠলো।
তারপর তাদের নাম বাতিল হয়ে গেলো।
কারও ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস হলো না।
শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র বাবু বললেন,
—সিদ্দিক মিয়ার কাছে রাখলে কেমন হয়?
ঘরের ভেতর এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
—ওর বয়স কত?
—তেইশ-চব্বিশ।
—এত বড় দায়িত্ব নিতে পারবে?
নরেন বাবু বললেন,
—জানি না পারবে কি না ; কিন্তু একটা কথা জানি—ও আমাদের ঠকাবে না।
এই একটি বাক্য কখনও কখনও মানুষের পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে।
সেদিনও করেছিলো।
৪#
রাত তখন অনেক।
সিদ্দিক পড়ার টেবিলে বসে ছিলো।
মাস্টার্সের বই খোলা সামনে। কিন্তু তার মন বইয়ে ছিলোনা। বাইরে অস্বাভাবিক নীরবতা।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
সে বেরিয়ে এসে দেখলো কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
সামনে নরেন্দ্র বাবু ও সুবোধ বাবু,সাথে যামিনী বাবু।
নরেন্দ্র বাবুর হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
সিদ্দিক বললো,
—এই সময়ে? সব ঠিক আছে তো কাকা?
কোন সমস্যা হয়েছে কি সুবোধ দা?
ঘটনা কী যামিনী দা?
সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর নরেন বাবু বললেন,
—আমরা চলে যাচ্ছি, বাবা!
—কোথায়?
—ইন্ডিয়া।
সিদ্দিকের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেলো!
নরেন বাবু ব্যাগটি তার সামনে রাখলেন।
—এগুলো রাখো।
ব্যাগের ভেতর দলিল,
খতিয়ান,
নকশা,
পুরোনো কাগজ।
সিদ্দিক বিস্মিত হয়ে তাকালো!
—আমি এগুলো নিয়ে কী করবো?
নরেন বাবু বললেন,
—রেখে দেবে।
—কতদিন?
বৃদ্ধ মানুষটি একটু হাসলেন।
সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিলোনা!
—যতদিন না আমরা ফিরে আসি।
সিদ্দিক এবার কিছু বলতে পারলো না।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালো।
এদের মধ্যে কেউ হয়তো আর কোনোদিন ফিরবে না!
কেউ হয়তো পথেই মারা যাবে!
কেউ হয়তো অন্য দেশে নতুন জীবন শুরু করবে!
তবুও তারা তাদের জমির কাগজপত্র নিয়ে যাচ্ছে না,
একজন তেইশ বছরের ছেলের হাতে রেখে যাচ্ছে!
কেন?
সিদ্দিক নিজেই প্রশ্নটির উত্তর জানতো না।
নরেন বাবু বললেন,
—আমরা বড় বড় মানুষের কাছে যেতে পারতাম। কিন্তু বড় মানুষ সবসময় বড় মনের হয় না।
কথাটা শুনে সিদ্দিক মাথা নিচু করলো।
তারপর বললো,
—আমি চেষ্টা করবো।
নরেন বাবু বললেন,
—চেষ্টা নয়।
সিদ্দিক মুখ তুললো।
বৃদ্ধ মানুষটির চোখে জল।
—কথা দাও।
অনেকক্ষণ নীরব থেকে সিদ্দিক বললো,
—কথা দিলাম।
৫#
পরদিন ভোরে তারা চলে গেলো!
কেউ সঙ্গে নিলো সামান্য কাপড়,
কেউ কিছু শুকনো খাবার,
কেউ পরিবারের পুরোনো একটি ছবি।
একটি শিশু তার মাটির খেলনাটি সঙ্গে নিতে চেয়েছিলো।
তার মা বলেছিলেন,
—ওটা নিয়ে কী হবে?
শিশুটি উত্তর দিয়েছিলো,
—আমি খেলবো।
শেষ পর্যন্ত খেলনাটিও নেওয়া হয়েছিলো।
মানুষ দেশ ছাড়ার সময়ও নিজের ছোট্ট পৃথিবীটুকু সঙ্গে নিতে চায়।
তারা চলে গেল!
গ্রাম ফাঁকা হয়ে গেল!
তারপর শুরু হলো দীর্ঘতম এক অচল সময়!
যুদ্ধ!
সিদ্দিকের ঘরের এক কোণে একটি কাঠের সিন্দুক ছিলো।
সেখানে রাখা ছিলো দলিলগুলো।
কিন্তু কয়েকদিন পর সে বুঝলো, সব কাগজ এক জায়গায় রাখা বিপজ্জনক!
এক রাতে সে সেগুলো বের করলো।
প্রতিটি কাগজ হাতে নিয়ে নাম পড়লো।
জমির পরিমাণ পড়লো।
দাগ নম্বর পড়লো।
তারপর নিজের একটি মোটা খাতায় সব লিখে রাখলো।
কার কতো জমি।
কোথায়।
কোন দাগে।
কোন খতিয়ানে।
ভোর হওয়ার আগেই সে কাগজগুলো কয়েক ভাগে ভাগ করে লুকিয়ে ফেললো।
এক অংশ মাটির নিচে।
এক অংশ ঘরের চালের ভেতরে।
আর কিছু নিজের কাছে।
তার মা সব দেখছিলো।
একসময় বললো,
—তুই কি পাগল হয়েছিস?
সিদ্দিক বললো,
—কেন?
—যুদ্ধ চলছে। মানুষ নিজের জান বাঁচাতে পারছে না। আর তুই অন্যের জমির কাগজ পাহারা দিচ্ছিস!
সিদ্দিক চুপ করে রইলো।
তার মা আবার বললো,
—ওরা যদি আর না ফেরে?
সিদ্দিক ধীরে ধীরে বললো,
—তবুও এগুলো আমার হবে না।
মা দীর্ঘক্ষণ তার ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর বললো,
—তোর বাবার মতোই হয়েছিস।
৬#
যুদ্ধ মানুষের সামনে অনেক সুযোগ এনে দেয়।
সব সুযোগ ভালো নয়।
একদিন গ্রামের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সিদ্দিককে ডেকে পাঠাল একটা বড় বাড়িতে।
উঠানভর্তি লোক।
তারা গ্রামের হর্তাকর্তা।
সিদ্দিক গিয়ে বসতেই একজন বললো,
—শুনেছি হিন্দুদের জমির কাগজপত্র তোমার কাছে আছে?
সিদ্দিক বললো,
—কিছু আছে।
লোকটি পান চিবোতে চিবোতে বললো,
—তারা আর ফিরবে না।
সিদ্দিক চুপ করে রইল।
—তুমি এখনো ছোট। পৃথিবী সম্পর্কে কিছু জানো না।
লোকটি হাসল।
—জমি কখনও মালিকহীন থাকে না।
সিদ্দিক এবার বললো,
—মালিক না থাকলেও জমি কারও হয়ে যায় না।
লোকটি তার দিকে তাকালো।
—তুমি কি আমাকে শেখাচ্ছো?
—না।
—তাহলে?
—আমি শুধু জানি, এগুলো আমার কাছে আমানত।
লোকটি একটু হেসে বললো,
—আমানত! যুদ্ধের সময় আমানত বলে কিছু থাকে?
সিদ্দিক শান্ত গলায় উত্তর দিলো,
—যুদ্ধের সময়ই সবচেয়ে বেশি থাকে।
লোকটি আর কিছু বলেনি।
সিদ্দিক উঠে চলে এসেছিলো।
ফেরার পথে তার মনে হয়েছিলো—মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয়তো কখনও কখনও বন্দুকের বিরুদ্ধে নয়,
নিজের ভেতরের লোভের বিরুদ্ধেও।
৭#
ডিসেম্বর এলো।
একদিন খবর এলো—দেশ স্বাধীন!
প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি।
তারপর রাস্তায় মানুষ বেরিয়ে এলো।
কেউ পতাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছে,
কেউ কাঁদছে!
কেউ অচেনা মানুষকে জড়িয়ে ধরছে!
একজন বৃদ্ধ মাটিতে বসে কাঁদছিলেন!
কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলো,
—চাচা, কাঁদছেন কেন?
বৃদ্ধ বললেন,
—এই দিনটা দেখার জন্য এতোদিন বেঁচে ছিলাম।সিদ্দিকও সেদিন আনন্দে মেতে উঠেছিলো!
কিন্তু রাতে ঘরে ফিরে তার মনে পড়লো কাঠের সিন্দুকটির কথা।
আর সেই মানুষগুলোর কথা।
যারা এক ভোরে চলে গিয়েছিলো।
তারা কি ফিরবে?
৮#
কয়েক মাস পর একদিন গ্রামের পথ দিয়ে কয়েকটি পরিবার ফিরে এলো।
দূর থেকে তাদের দেখে মনে হচ্ছিলো, তারা যেন কোনো দেশ থেকে নয়—একটি দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন থেকে ফিরে এসেছে!
কাঁধে ব্যাগ,
কোলে শিশু,
চোখে ক্লান্তি!
তাদের মধ্যে নরেন্দ্র বাবু,সুবোধ বাবু,যামিনী বাবুও ছিলেন।
সিদ্দিক তাদের দেখেই এগিয়ে গেলো।
মানুষগুলো কিছুক্ষণ তার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো।
তারপর বললো,
—চিনতে পেরেছিস?
সিদ্দিক হাসলো।
—না চিনে উপায় আছে?
নরেন বাবুরা হেসেছিলেন।
তারপর সেই হাসি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলো!
সিদ্দিক তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো।
ঘরের দরজা বন্ধ করলো।
তারপর ধীরে ধীরে সেই কাঠের সিন্দুকের কাছে গেলো।
নরেন বাবুরা তাকিয়ে আছেন।
সিদ্দিক সিন্দুকের ডালা খুলে
একটি কাপড়ের পুঁটলি বের করলো।
তারপর আরেকটি।
তারপর সেই মোটা খাতা।
প্রথম পাতায় লেখা ছিলো—
আমানতের হিসাব।
নরেন বাবুর হাত কাঁপছিলো!
সিদ্দিক বললো,
—এটা আপনার।
বৃদ্ধ মানুষটি কাগজ হাতে নিলেন।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—সব আছে?
—সব।
—কিছু হয়নি?
—না।
নরেন বাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—একটাও কমেনি?
সিদ্দিক মৃদু হেসে বলল,
—কমার কথা কেন?
বৃদ্ধ মানুষটি এবার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না!
তিনি কাগজগুলো বুকে চেপে ধরলেন।
অনেকক্ষণ পরে বললেন,
—আমরা যখন চলে গিয়েছিলাম, তখন শুধু একটা ভয় ছিলো!
সিদ্দিক জিজ্ঞেস করলো,
—কীসের ভয় কাকা?
—ফিরে এসে যদি দেখি, আমাদের আর কিছু নাই!
সিদ্দিক চুপ করে রইলো।
নরেন বাবু বললেন,
—দেশ স্বাধীন হয়েছে, বাবা। আমরা দেশ ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমরা শুধু দেশ না—মানুষকেও ফিরে পেয়েছি।
সিদ্দিকের গলা শুকিয়ে গেলো।
সে কিছু বলতে পারলোনা।
৯#
সেদিন বিকেলে গ্রামের কয়েকজন মানুষ সিদ্দিকের বাড়ির উঠানে বসেছিলো।
একজন একজন করে সবাই নিজেদের কাগজপত্র বুঝে নিচ্ছে।
কারও পুকুর,
কারও ধানের জমি,
কারও বসতভিটা।
যে জমিগুলো নয় মাস ধরে মালিকহীন ছিল, সেগুলোর মালিকেরা আবার ফিরে এসেছে।
একজন বৃদ্ধা দলিল হাতে নিয়ে বললেন,
—বাবা, আমরা তোকে কী দেবো?
সিদ্দিক মাথা নাড়ল।
—কিছু না।
—কেন?
—কারণ এগুলো আমার ছিলো না।
বৃদ্ধা বললেন,
—কিন্তু তুই চাইলে নিজের করে নিতে পারতি।
সিদ্দিক উত্তর দিলোনা।
সুবোধ বাবু পাশে বসে ছিলেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
—না মা, ও পারতো না।
সবাই তার দিকে তাকালো।
বৃদ্ধা বললেন,
—যে মানুষ বিশ্বাসের দাম জানে, সে অন্যের জমির দাম জানে না।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে মাটির ওপর থেকে সরে যাচ্ছিলো।
দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।
কোথাও শাঁখ বাজলো।
যুদ্ধের আগে যেমন বাজতো।
গ্রামটি আবার ধীরে ধীরে তার পুরোনো শব্দগুলো ফিরে পাচ্ছিলো।
কিন্তু মানুষগুলো আর আগের মতো ছিলো না।
যুদ্ধ তাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।
কে বন্ধু,
কে শত্রু,
কে ভীরু,
কে সাহসী।
আর কে বিশ্বাসের যোগ্য।
১০#
বহু বছর পরে, গ্রামের মানুষ যখন সেই সময়ের কথা বলতো,
তারা মুক্তিযুদ্ধের বড় বড় ঘটনার পাশাপাশি একটা ছোট্ট ঘটনার কথাও বলতো।
একটি গ্রামের কয়েকটি পরিবার যুদ্ধের ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।
তারা তাদের জমিজমা, দলিলপত্র ও ভিটেমাটির হিসাব রেখে গিয়েছিলো তেইশ-চব্বিশ বছরের এক তরুণ স্কুলশিক্ষকের কাছে।
যুদ্ধ শেষ হয়েছিলো,
দেশ স্বাধীন হয়েছিলো,
মানুষ ফিরে এসেছিলো,
আর সেই তরুণ তাদের সবকিছু ফিরিয়ে দিয়েছিলো।
একটি কাগজও কম ছিলো না।
একটি হিসাবও বদলায়নি।
ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়নি।
কোনো স্মৃতিস্তম্ভে তার ছবি নেই।
কোনো পদকও সে পায়নি।
তবু সে ইতিহাসেরই একজন মানুষ।
কারণ ইতিহাস শুধু তাদের দিয়ে তৈরি হয় না, যারা বন্দুক হাতে যুদ্ধ করে।
ইতিহাস তৈরি হয় তাদের দিয়েও—
যারা অন্ধকার সময়ে আলো নিভতে দেয়না।
যারা সুযোগ পেয়েও অন্যায় করে না।
যারা জানে, মানুষের দেওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ জমি নয়,
টাকা নয়,
ক্ষমতা নয়।
সবচেয়ে বড় আমানত হলো বিশ্বাস।
আর যে মানুষ সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে,
সে হয়তো বড় মানুষ নয়—
কিন্তু মানুষের ইতিহাসে সে কখনও ছোট হয়ে থাকে না।
★★★
###
পুনশ্চঃ এই সিদ্দিক ছেলেটি আমার বাবা সিদ্দিক মাস্টার।
বাবা কোনদিন আমাদের এই গল্প বলেননি।একদিন শুধু জানতে চেয়েছিলাম,
“তুমি যুদ্ধে যাওনি কেন বাবা?”
তিনি তখন কেবল ক্যাপ্টেন চৌহানের গল্পটি বলেছিলেন, আর কিচ্ছু না।
কয়েকদিন আগে পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে তাঁর কাছে রেখে যাওয়া আমানতের একটি দলিল চোখে পড়লো।এরপর এই কাহিনি জানতে পারি।
সুবোধ কাকা এখনো বেঁচে আছেন।
একশোর উপরে বয়স-ইতিহাসের একজন জলজ্যান্ত সাক্ষী।
বাবা মুক্তিযোদ্ধা না হওয়ার আক্ষেপ এখন আর নেই।সবার অলক্ষ্যে তিনিও এক ভিন্ন ধরণের যুদ্ধ করে গেছেন সেইসময়, যা জানতে পেরেছি ৫৫ বছর পর ; যখন বাবা বসে আছেন সুদূরের কোনো নক্ষত্রে!
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Gojnobi biplob

স্বামী বিদেশে থাকতেই অন্তঃসত্ত্বা, পরে গোপন গর্ভপাতের অভিযোগ চিকিৎসা প্রতিবেদনে ‘অসম্পূর্ণ গর্ভপাত’, এফিডেভিটের পর ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য

যুদ্ধদিনের গল্প–জাহাঙ্গীর খান

প্রকাশের সময় : ১১:১৪:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি- সুবোধ
১#
বসন্তকাল,১৯৭১।
কিন্তু মানুষের ঘরে বসন্ত ছিলোনা!
ফাগুনের শেষে গ্রামের শিমুলগাছগুলো লাল হয়ে উঠেছিলো।
দূরের মাঠে বাতাস বইলে শুকনো ধানের খড় উড়ে যেতো।
সন্ধ্যার পর পুকুরের জলে কুয়াশা নামতো।
সবকিছু আগের মতোই ছিলো—শুধু মানুষের চোখগুলো বদলে গিয়েছিলো।
সেই চোখে তখন ঘুম ছিলোনা!
ছিলো ভয়!
ঢাকা থেকে খবর আসছিলো ;
খবরের সঙ্গে সঙ্গে আসছিলো গুজব।
রাতের অন্ধকারে নাকি শহর জ্বলছে!
মানুষকে ঘর থেকে বের করে হত্যা করা হচ্ছে!
রাস্তার পড়ে আছে সারি সারি লাশ!
কেউ বলতো,পাকবাহিনী আসছে!
কেউ বলতো, তারা ইতিমধ্যে পাশের থানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে!
গ্রামের মানুষ জানতো না কোন খবরটি সত্য, কোনটি গুজব।
কিন্তু ভয় সত্য ছিল!
ভয়কে প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।
গ্রামের নাম টেংগা।
বড় গ্রাম।
গ্রামের অধিবাসীদের অর্ধেকই হিন্দু।
হিন্দু-মুসলমানের বাড়ি পাশাপাশি।
একই বাজার, একই স্কুল, একই কাঁচা রাস্তা।
বর্ষায় কারও বাড়িতে নৌকা লাগতো, শীতকালে সবাই একই মাঠে ধান কাটতো।
ধর্ম আলাদা ছিল।
জীবন ছিল এক।
স্থানীয় হাইস্কুলে ইংরেজি পড়াতো সেই গ্রামের এক তরুণ।
তার ডাক নাম সিদ্দিক।
বয়স তেইশ কি চব্বিশ।
সদ্য ডিগ্রি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে।
ছেলেটি খুব বড় কোনো মানুষ ছিলোনা।
তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ও ছিলোনা।
মধ্যবিত্ত গেরস্থ ঘরের ছেলে।
এই পরিচয়ের বাইরে তার আর কোন পরিচয় নেই,কেবল একজন ভালো ছাত্র ছাড়া।
আর ছিলো শুধু একটি জিনিস—
সুনাম।
গ্রামে কেউ বলতে পারতো না, সিদ্দিক কারও সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
কেউ বলতে পারতো না, কারও পাওনা মেরে দিয়েছে।
কেউ বলতে পারতো না,
দুর্বল কাউকে ঠকিয়েছে।
তার বাবা প্রায়ই বলতেন,
—মানুষের ঘরে টাকা না থাকলেও চলে। কিন্তু মানুষের নামে দাগ থাকলে চলে না।
সিদ্দিক ছোটবেলায় কথাটা শুনতো।
বড় হতে হতে বুঝেছিলো—কিছু শিক্ষা বই থেকে আসে না।
২#
মার্চের শেষ সপ্তাহে সিদ্দিক সিদ্ধান্ত নিলো যুদ্ধে যাবে।ইতোমধ্যে নবম শ্রেণী পড়ুয়া তার দুই ভাগ্নে পালিয়ে যুদ্ধে চলে গেছে।সে পরের মাসে কাউকে না জানিয়ে চলে গেলো মহিষখোলা সীমান্তে।
সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটমেন্ট সেন্টারে।
সেখানে দায়িত্বরত ভারতীয় বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহান তার সবকিছু শুনে বললো,
তুমি ফিরে যাও,স্কুলে মাস্টারি করতে থাকো।পাকবাহিনী তোমার এলাকায় আসলে তুমি তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে তাদের কনভিন্স করবা,এলাকার মানুষ এবং মুক্তিবাহিনীকে প্রটেকশন দিবা।এইটাই তোমার কাজ।
সিদ্দিক ফিরে এলো তার স্কুলে।
৩#
শোনা যাচ্ছে পাকবাহিনী নেত্রকোণা পর্যন্ত চলে এসেছে!যেকোনো সময় তেলিগাতী বাজারে ক্যাম্প করবে!
আগস্টের শেষ সপ্তাহে গ্রামের হিন্দুপাড়ায় প্রথম আতঙ্ক নেমে এলো!
পাশের হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম থেকে কয়েকটি পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছে।
তাদের চোখে এমন এক ভয় ছিলো, যা দেখে গ্রামের মানুষ বুঝে গেল—খবরগুলো মিথ্যা নয়।
এক বৃদ্ধ লোক বলেছিলো,
—ঘর জ্বলতে দেখেছি।
আরেকজন বলেছিলো,
—মানুষকে মারতে দেখেছি।
তারপর তারা আর কথা বলতে পারেনি।
সেদিন রাতেই হিন্দুপাড়ার কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ্য মানুষ একটি বাড়িতে গোল হয়ে বসলো।
হারিকেনের আবছা আলোয় তাদের মুখগুলো হলদে হয়ে উঠেছিলো।
কেউ কথা বলছিলো না।
শেষ পর্যন্ত বয়োজ্যেষ্ঠ নরেন্দ্র কর বললেন,
—আমাদের চলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই!
কেউ প্রতিবাদ করল না।
কেবল একজন বৃদ্ধা বললেন,
—এই বয়সে কোথায় যাব?
তার ছেলে উত্তর দিল,
—মা, বেঁচে থাকলে আবার ফিরবো।
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন!
মানুষের জীবনে কিছু কথা আছে, যার উত্তর দেওয়া যায় না!
“আবার ফিরবো”—এই কথাটিও তেমন।
সিদ্ধান্ত হলো, তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাবে।
কিন্তু চলে যাওয়ার আগে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়াল।
জমিজমা কার কাছে রেখে যাবে?
এমন প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
একজন মানুষ নিজের ঘর বন্ধ করে চলে যেতে পারে। কিন্তু জমির দরজায় তালা দেওয়া যায় না।
ধানের জমি পড়ে থাকবে,
পুকুর থাকবে,
বাঁশঝাড় থাকবে,
বাড়ির ভিটা থাকবে।
আর মানুষের লোভও থাকবে।
প্রথমে গ্রামের কয়েকজন ধনী মানুষের নাম উঠলো।
তারপর তাদের নাম বাতিল হয়ে গেলো।
কারও ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস হলো না।
শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র বাবু বললেন,
—সিদ্দিক মিয়ার কাছে রাখলে কেমন হয়?
ঘরের ভেতর এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
—ওর বয়স কত?
—তেইশ-চব্বিশ।
—এত বড় দায়িত্ব নিতে পারবে?
নরেন বাবু বললেন,
—জানি না পারবে কি না ; কিন্তু একটা কথা জানি—ও আমাদের ঠকাবে না।
এই একটি বাক্য কখনও কখনও মানুষের পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে।
সেদিনও করেছিলো।
৪#
রাত তখন অনেক।
সিদ্দিক পড়ার টেবিলে বসে ছিলো।
মাস্টার্সের বই খোলা সামনে। কিন্তু তার মন বইয়ে ছিলোনা। বাইরে অস্বাভাবিক নীরবতা।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
সে বেরিয়ে এসে দেখলো কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
সামনে নরেন্দ্র বাবু ও সুবোধ বাবু,সাথে যামিনী বাবু।
নরেন্দ্র বাবুর হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
সিদ্দিক বললো,
—এই সময়ে? সব ঠিক আছে তো কাকা?
কোন সমস্যা হয়েছে কি সুবোধ দা?
ঘটনা কী যামিনী দা?
সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর নরেন বাবু বললেন,
—আমরা চলে যাচ্ছি, বাবা!
—কোথায়?
—ইন্ডিয়া।
সিদ্দিকের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেলো!
নরেন বাবু ব্যাগটি তার সামনে রাখলেন।
—এগুলো রাখো।
ব্যাগের ভেতর দলিল,
খতিয়ান,
নকশা,
পুরোনো কাগজ।
সিদ্দিক বিস্মিত হয়ে তাকালো!
—আমি এগুলো নিয়ে কী করবো?
নরেন বাবু বললেন,
—রেখে দেবে।
—কতদিন?
বৃদ্ধ মানুষটি একটু হাসলেন।
সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিলোনা!
—যতদিন না আমরা ফিরে আসি।
সিদ্দিক এবার কিছু বলতে পারলো না।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালো।
এদের মধ্যে কেউ হয়তো আর কোনোদিন ফিরবে না!
কেউ হয়তো পথেই মারা যাবে!
কেউ হয়তো অন্য দেশে নতুন জীবন শুরু করবে!
তবুও তারা তাদের জমির কাগজপত্র নিয়ে যাচ্ছে না,
একজন তেইশ বছরের ছেলের হাতে রেখে যাচ্ছে!
কেন?
সিদ্দিক নিজেই প্রশ্নটির উত্তর জানতো না।
নরেন বাবু বললেন,
—আমরা বড় বড় মানুষের কাছে যেতে পারতাম। কিন্তু বড় মানুষ সবসময় বড় মনের হয় না।
কথাটা শুনে সিদ্দিক মাথা নিচু করলো।
তারপর বললো,
—আমি চেষ্টা করবো।
নরেন বাবু বললেন,
—চেষ্টা নয়।
সিদ্দিক মুখ তুললো।
বৃদ্ধ মানুষটির চোখে জল।
—কথা দাও।
অনেকক্ষণ নীরব থেকে সিদ্দিক বললো,
—কথা দিলাম।
৫#
পরদিন ভোরে তারা চলে গেলো!
কেউ সঙ্গে নিলো সামান্য কাপড়,
কেউ কিছু শুকনো খাবার,
কেউ পরিবারের পুরোনো একটি ছবি।
একটি শিশু তার মাটির খেলনাটি সঙ্গে নিতে চেয়েছিলো।
তার মা বলেছিলেন,
—ওটা নিয়ে কী হবে?
শিশুটি উত্তর দিয়েছিলো,
—আমি খেলবো।
শেষ পর্যন্ত খেলনাটিও নেওয়া হয়েছিলো।
মানুষ দেশ ছাড়ার সময়ও নিজের ছোট্ট পৃথিবীটুকু সঙ্গে নিতে চায়।
তারা চলে গেল!
গ্রাম ফাঁকা হয়ে গেল!
তারপর শুরু হলো দীর্ঘতম এক অচল সময়!
যুদ্ধ!
সিদ্দিকের ঘরের এক কোণে একটি কাঠের সিন্দুক ছিলো।
সেখানে রাখা ছিলো দলিলগুলো।
কিন্তু কয়েকদিন পর সে বুঝলো, সব কাগজ এক জায়গায় রাখা বিপজ্জনক!
এক রাতে সে সেগুলো বের করলো।
প্রতিটি কাগজ হাতে নিয়ে নাম পড়লো।
জমির পরিমাণ পড়লো।
দাগ নম্বর পড়লো।
তারপর নিজের একটি মোটা খাতায় সব লিখে রাখলো।
কার কতো জমি।
কোথায়।
কোন দাগে।
কোন খতিয়ানে।
ভোর হওয়ার আগেই সে কাগজগুলো কয়েক ভাগে ভাগ করে লুকিয়ে ফেললো।
এক অংশ মাটির নিচে।
এক অংশ ঘরের চালের ভেতরে।
আর কিছু নিজের কাছে।
তার মা সব দেখছিলো।
একসময় বললো,
—তুই কি পাগল হয়েছিস?
সিদ্দিক বললো,
—কেন?
—যুদ্ধ চলছে। মানুষ নিজের জান বাঁচাতে পারছে না। আর তুই অন্যের জমির কাগজ পাহারা দিচ্ছিস!
সিদ্দিক চুপ করে রইলো।
তার মা আবার বললো,
—ওরা যদি আর না ফেরে?
সিদ্দিক ধীরে ধীরে বললো,
—তবুও এগুলো আমার হবে না।
মা দীর্ঘক্ষণ তার ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর বললো,
—তোর বাবার মতোই হয়েছিস।
৬#
যুদ্ধ মানুষের সামনে অনেক সুযোগ এনে দেয়।
সব সুযোগ ভালো নয়।
একদিন গ্রামের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সিদ্দিককে ডেকে পাঠাল একটা বড় বাড়িতে।
উঠানভর্তি লোক।
তারা গ্রামের হর্তাকর্তা।
সিদ্দিক গিয়ে বসতেই একজন বললো,
—শুনেছি হিন্দুদের জমির কাগজপত্র তোমার কাছে আছে?
সিদ্দিক বললো,
—কিছু আছে।
লোকটি পান চিবোতে চিবোতে বললো,
—তারা আর ফিরবে না।
সিদ্দিক চুপ করে রইল।
—তুমি এখনো ছোট। পৃথিবী সম্পর্কে কিছু জানো না।
লোকটি হাসল।
—জমি কখনও মালিকহীন থাকে না।
সিদ্দিক এবার বললো,
—মালিক না থাকলেও জমি কারও হয়ে যায় না।
লোকটি তার দিকে তাকালো।
—তুমি কি আমাকে শেখাচ্ছো?
—না।
—তাহলে?
—আমি শুধু জানি, এগুলো আমার কাছে আমানত।
লোকটি একটু হেসে বললো,
—আমানত! যুদ্ধের সময় আমানত বলে কিছু থাকে?
সিদ্দিক শান্ত গলায় উত্তর দিলো,
—যুদ্ধের সময়ই সবচেয়ে বেশি থাকে।
লোকটি আর কিছু বলেনি।
সিদ্দিক উঠে চলে এসেছিলো।
ফেরার পথে তার মনে হয়েছিলো—মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয়তো কখনও কখনও বন্দুকের বিরুদ্ধে নয়,
নিজের ভেতরের লোভের বিরুদ্ধেও।
৭#
ডিসেম্বর এলো।
একদিন খবর এলো—দেশ স্বাধীন!
প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি।
তারপর রাস্তায় মানুষ বেরিয়ে এলো।
কেউ পতাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছে,
কেউ কাঁদছে!
কেউ অচেনা মানুষকে জড়িয়ে ধরছে!
একজন বৃদ্ধ মাটিতে বসে কাঁদছিলেন!
কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলো,
—চাচা, কাঁদছেন কেন?
বৃদ্ধ বললেন,
—এই দিনটা দেখার জন্য এতোদিন বেঁচে ছিলাম।সিদ্দিকও সেদিন আনন্দে মেতে উঠেছিলো!
কিন্তু রাতে ঘরে ফিরে তার মনে পড়লো কাঠের সিন্দুকটির কথা।
আর সেই মানুষগুলোর কথা।
যারা এক ভোরে চলে গিয়েছিলো।
তারা কি ফিরবে?
৮#
কয়েক মাস পর একদিন গ্রামের পথ দিয়ে কয়েকটি পরিবার ফিরে এলো।
দূর থেকে তাদের দেখে মনে হচ্ছিলো, তারা যেন কোনো দেশ থেকে নয়—একটি দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন থেকে ফিরে এসেছে!
কাঁধে ব্যাগ,
কোলে শিশু,
চোখে ক্লান্তি!
তাদের মধ্যে নরেন্দ্র বাবু,সুবোধ বাবু,যামিনী বাবুও ছিলেন।
সিদ্দিক তাদের দেখেই এগিয়ে গেলো।
মানুষগুলো কিছুক্ষণ তার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো।
তারপর বললো,
—চিনতে পেরেছিস?
সিদ্দিক হাসলো।
—না চিনে উপায় আছে?
নরেন বাবুরা হেসেছিলেন।
তারপর সেই হাসি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলো!
সিদ্দিক তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো।
ঘরের দরজা বন্ধ করলো।
তারপর ধীরে ধীরে সেই কাঠের সিন্দুকের কাছে গেলো।
নরেন বাবুরা তাকিয়ে আছেন।
সিদ্দিক সিন্দুকের ডালা খুলে
একটি কাপড়ের পুঁটলি বের করলো।
তারপর আরেকটি।
তারপর সেই মোটা খাতা।
প্রথম পাতায় লেখা ছিলো—
আমানতের হিসাব।
নরেন বাবুর হাত কাঁপছিলো!
সিদ্দিক বললো,
—এটা আপনার।
বৃদ্ধ মানুষটি কাগজ হাতে নিলেন।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—সব আছে?
—সব।
—কিছু হয়নি?
—না।
নরেন বাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—একটাও কমেনি?
সিদ্দিক মৃদু হেসে বলল,
—কমার কথা কেন?
বৃদ্ধ মানুষটি এবার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না!
তিনি কাগজগুলো বুকে চেপে ধরলেন।
অনেকক্ষণ পরে বললেন,
—আমরা যখন চলে গিয়েছিলাম, তখন শুধু একটা ভয় ছিলো!
সিদ্দিক জিজ্ঞেস করলো,
—কীসের ভয় কাকা?
—ফিরে এসে যদি দেখি, আমাদের আর কিছু নাই!
সিদ্দিক চুপ করে রইলো।
নরেন বাবু বললেন,
—দেশ স্বাধীন হয়েছে, বাবা। আমরা দেশ ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমরা শুধু দেশ না—মানুষকেও ফিরে পেয়েছি।
সিদ্দিকের গলা শুকিয়ে গেলো।
সে কিছু বলতে পারলোনা।
৯#
সেদিন বিকেলে গ্রামের কয়েকজন মানুষ সিদ্দিকের বাড়ির উঠানে বসেছিলো।
একজন একজন করে সবাই নিজেদের কাগজপত্র বুঝে নিচ্ছে।
কারও পুকুর,
কারও ধানের জমি,
কারও বসতভিটা।
যে জমিগুলো নয় মাস ধরে মালিকহীন ছিল, সেগুলোর মালিকেরা আবার ফিরে এসেছে।
একজন বৃদ্ধা দলিল হাতে নিয়ে বললেন,
—বাবা, আমরা তোকে কী দেবো?
সিদ্দিক মাথা নাড়ল।
—কিছু না।
—কেন?
—কারণ এগুলো আমার ছিলো না।
বৃদ্ধা বললেন,
—কিন্তু তুই চাইলে নিজের করে নিতে পারতি।
সিদ্দিক উত্তর দিলোনা।
সুবোধ বাবু পাশে বসে ছিলেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
—না মা, ও পারতো না।
সবাই তার দিকে তাকালো।
বৃদ্ধা বললেন,
—যে মানুষ বিশ্বাসের দাম জানে, সে অন্যের জমির দাম জানে না।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে মাটির ওপর থেকে সরে যাচ্ছিলো।
দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।
কোথাও শাঁখ বাজলো।
যুদ্ধের আগে যেমন বাজতো।
গ্রামটি আবার ধীরে ধীরে তার পুরোনো শব্দগুলো ফিরে পাচ্ছিলো।
কিন্তু মানুষগুলো আর আগের মতো ছিলো না।
যুদ্ধ তাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।
কে বন্ধু,
কে শত্রু,
কে ভীরু,
কে সাহসী।
আর কে বিশ্বাসের যোগ্য।
১০#
বহু বছর পরে, গ্রামের মানুষ যখন সেই সময়ের কথা বলতো,
তারা মুক্তিযুদ্ধের বড় বড় ঘটনার পাশাপাশি একটা ছোট্ট ঘটনার কথাও বলতো।
একটি গ্রামের কয়েকটি পরিবার যুদ্ধের ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।
তারা তাদের জমিজমা, দলিলপত্র ও ভিটেমাটির হিসাব রেখে গিয়েছিলো তেইশ-চব্বিশ বছরের এক তরুণ স্কুলশিক্ষকের কাছে।
যুদ্ধ শেষ হয়েছিলো,
দেশ স্বাধীন হয়েছিলো,
মানুষ ফিরে এসেছিলো,
আর সেই তরুণ তাদের সবকিছু ফিরিয়ে দিয়েছিলো।
একটি কাগজও কম ছিলো না।
একটি হিসাবও বদলায়নি।
ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়নি।
কোনো স্মৃতিস্তম্ভে তার ছবি নেই।
কোনো পদকও সে পায়নি।
তবু সে ইতিহাসেরই একজন মানুষ।
কারণ ইতিহাস শুধু তাদের দিয়ে তৈরি হয় না, যারা বন্দুক হাতে যুদ্ধ করে।
ইতিহাস তৈরি হয় তাদের দিয়েও—
যারা অন্ধকার সময়ে আলো নিভতে দেয়না।
যারা সুযোগ পেয়েও অন্যায় করে না।
যারা জানে, মানুষের দেওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ জমি নয়,
টাকা নয়,
ক্ষমতা নয়।
সবচেয়ে বড় আমানত হলো বিশ্বাস।
আর যে মানুষ সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে,
সে হয়তো বড় মানুষ নয়—
কিন্তু মানুষের ইতিহাসে সে কখনও ছোট হয়ে থাকে না।
★★★
###
পুনশ্চঃ এই সিদ্দিক ছেলেটি আমার বাবা সিদ্দিক মাস্টার।
বাবা কোনদিন আমাদের এই গল্প বলেননি।একদিন শুধু জানতে চেয়েছিলাম,
“তুমি যুদ্ধে যাওনি কেন বাবা?”
তিনি তখন কেবল ক্যাপ্টেন চৌহানের গল্পটি বলেছিলেন, আর কিচ্ছু না।
কয়েকদিন আগে পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে তাঁর কাছে রেখে যাওয়া আমানতের একটি দলিল চোখে পড়লো।এরপর এই কাহিনি জানতে পারি।
সুবোধ কাকা এখনো বেঁচে আছেন।
একশোর উপরে বয়স-ইতিহাসের একজন জলজ্যান্ত সাক্ষী।
বাবা মুক্তিযোদ্ধা না হওয়ার আক্ষেপ এখন আর নেই।সবার অলক্ষ্যে তিনিও এক ভিন্ন ধরণের যুদ্ধ করে গেছেন সেইসময়, যা জানতে পেরেছি ৫৫ বছর পর ; যখন বাবা বসে আছেন সুদূরের কোনো নক্ষত্রে!