
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা শুটার ফয়সাল করিম মাসুদের অবস্থান নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য মিলছে না। পুলিশ বলছে, ফয়সাল করিম দেশে না ভারতে, এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা নিয়েছেন আদালত।
এদিকে একই দিন ফয়সাল করিমকে ভারতে পালাতে সহায়তা করার অভিযোগে দুইজনকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সব মিলিয়ে হাদি হত্যার ৯ দিন পরও মূল অভিযুক্তকে নিয়ে অথৈ সাগরে পুলিশ।
ওসমান হাদির হত্যাকারী দেশের বাইরে চলে গেছেন কি না এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক সময় অপরাধীদের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ‘পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ সংবাদ সম্মেলনে’ এ কথা বলেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম। এদিকে সন্দেহভাজন ফয়সাল করিমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।
শুটার ফয়সাল করিম সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ফয়সালের শেষ অবস্থান নিয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এটা পেতে আমাদের বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। তবে সে যে দেশের বাইরে চলে গেছে, এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি। অনেক সময় অপরাধীদের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়।
হত্যাকাণ্ডে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা এখনো স্পেসিফিক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা পাইনি। তবে আমরা সঠিক তথ্য পেতে চেষ্টা করছি।
ফয়সাল করিম মাসুদের তথ্য সম্পর্কে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ফয়সাল করিম মাসুদের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আপনারা (সাংবাদিক) যেমন শুনতেছেন, আমরাও বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছি। তদন্তের স্বার্থে সবগুলো তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনে হচ্ছে ব্যক্তিগত কোনো শুত্রুতা নয়, রাজনৈতিকভাবে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। ফয়সাল ও আলমগীরকে এখনো গ্রেফতার করতে পারিনি, ফলে সেভাবে এখনো জানা যায়নি।
ডিবিপ্রধান বলেন, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাদিকে গুলির পর প্রত্যেক ইউনিটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসামি গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ জনকে বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, অস্ত্র, গুলি ও পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে।
শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ছবি আপলোড করেছিল, সেটি ভারত থেকে আপলোড করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। আপনারা ছবিটি ফরেনসিক করেছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তাধীন বিষয়। সবগুলো বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজে দেখেছি- হাদির পাশে আসামিরা ছিলেন।
তারা কার মাধ্যমে এসেছিলেন। অর্থাৎ মাস্টারমাইন্ড কারা। এসব বিষয় আপনারা তদন্ত করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, এটি বড় তদন্তাধীন বিষয়। তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।
এর আগে গতকাল দুপুরে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, হাদির হত্যাকারী ফয়সাল ও তার সহযোগী ভারতে পালিয়ে গেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাক্ষাৎকারে ডিবিপ্রধান দাবি করেন, গত আট দিনে তারা (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) হাদি হত্যা মামলার বিষয়ে ‘বেশ খানিকটা অগ্রগতি’ সাধন করতে সক্ষম হয়েছেন।
ওসমান হাদিকে হত্যার মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল করিমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মোহাম্মদ জুনায়েদ এ আদেশ দেন। প্রসিকিউশন পুলিশের ডিসি মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান এ তথ্য জানিয়েছেন।
এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, ‘গুপ্তচরের মাধ্যমে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, এজাহারনামীয় পলাতক আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ যে কোনো সময় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারেন। এজন্য তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন।’ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের গত ১৪ ডিসেম্বর পল্টন মডেল থানায় এ মামলা করেন।
ওসমান হাদিকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি ফয়সাল করিমকে ভারতে পালাতে সহযোগিতাকারী সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিমের দ্বিতীয় দফায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর তাদের প্রথম দফায় ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত।
শুটার ফয়সালসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার ‘লেনদেন’ : ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব লেনদেন বিশ্লেষণে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে সিআইডি এ অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। এ ঘটনায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অর্থ পাচার সংক্রান্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে সংস্থাটি।
গতকাল রাতে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওরফে রাহুল এখনো গ্রেপ্তার না হলেও মামলার আলামত গোপন ও অভিযুক্তকে পালাতে সহায়তার অভিযোগে তার পরিবারের সদস্যসহ একাধিক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অভিযানের সময় উদ্ধার বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইয়ের তথ্য সিআইডি গুরুত্ব নিয়ে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু করে। এতে দেখা যায়, অভিযুক্ত ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বেশকিছু চেক বইয়ে বিভিন্ন পরিমাণ অর্থের কথা উল্লেখ রয়েছে। চূড়ান্ত লেনদেন সম্পন্ন না হওয়া এসব রেকর্ডের সমষ্টিগত মূল্য প্রায় ২১৮ কোটি টাকা।
তবে সিআইডির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযুক্ত এবং তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেন সংঘটিত হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংক্রান্ত অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে।
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে কালভার্ট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি। এরপর তাকে প্রথমে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে একটি অপারেশনের পর নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে।
তবে এ হাসপাতালেও হাদির অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে তিন দিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানে চিকিৎসাধীন বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান তিনি।
বেঙ্গল নিউজ ডেক্স 








