ঢাকা ০৮:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভিক্ষার টাকা সুদে লাগিয়ে তিন বাড়ির মালিক, আরও আছে প্রাইভেট !

ছবি সংগৃহিত

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের ব্যস্ত শরাফা বাজারে বেয়ারিং লাগানো একটি লোহার গাড়িতে বসে আছেন এক ব্যক্তি। তার কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো। দুই হাতে একজোড়া জুতা। হাত দিয়ে গাড়ি ঠেলে বাজারের একপাশ থেকে অন্য পাশে ঘুরছেন। আবার কখনও লোহার গাড়িতে বসে থাকেন। মানুষ তাকে দেখলে ভেবেই নিতে পারে, অসহায় এই মানুষটির পাশে দাঁড়ানো উচিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি পথচারী কারও কাছে ভিক্ষা চান না। কিন্তু তিনি এমনভাবে বসেন যাতে করে মানুষ তাকে অর্থ সহায়তা দেয়।

ব্যক্তিটির নাম মঙ্গিলাল। তিনি একজন কোটিপতি শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার তিনটি বাড়ি আছে। এর মধ্যে একটি সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া। আরও আছে একটি মারুতি সুজুকি গাড়ি ও তিনটি অটোরিকশা।

সম্প্রতি ইন্দোরে নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগের ভিক্ষুকবিরোধী অভিযানের সময় মঙ্গিলাল সম্পর্কে এ তথ্য জানা যায়। গত শনিবার গভীর রাতে অভিযানকারী দল মঙ্গিলালকে তুলে নিয়ে যায়। একজন কুষ্ঠরোগী ওই এলাকায় নিয়মিত ভিক্ষা করছেন, এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।

অভিযানকারী দল মনে করেছিল, এটি অন্যান্য সাধারণ অভিযানের মতো হবে। কিন্তু পরে তারা মঙ্গিলাল সম্পর্কে চমকপ্রদ সব তথ্য জানতে পারে।

দীর্ঘদিন মঙ্গিলাল কোনো কথা না বলেই সাহায্য চাওয়ার কৌশল আয়ত্ত করেন। তিনি কখনো সরাসরি কিছু চাইতেন না। লোহার গাড়িতে বসে থাকতেন। মানুষ তার এ অবস্থা দেখে সহানুভূতিশীল হয়ে যে যা খুশি দান করতেন। প্রতিদিন ভিক্ষা করে ৪০০ থেকে ৫০০ রুপি পেতেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গিলালের আসল ‘ব্যবসা’ শুরু হতো সন্ধ্যার পর।

জিজ্ঞাসাবাদে মঙ্গিলাল জানিয়েছেন, ভিক্ষার অর্থ তিনি খরচ করতেন না। বরং ওই অর্থ বিনিয়োগ করতেন। তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এক দিন বা এক সপ্তাহের জন্য সুদে অর্থ ধার দিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নিজেই সুদের অর্থ সংগ্রহ করতেন।

সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, তিনি প্রায় চার–পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছেন। যেখান থেকে তিনি সুদসহ দৈনিক এক থেকে দুই হাজার রুপি আয় করতেন।

ওই ব্যক্তিকে একসময় কপর্দকহীন মনে করা হতো। কিন্তু দেখা গেল, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তিনটি বাড়ির মালিক তিনি, যার মধ্যে একটি তিনতলা ভবন রয়েছে।

এ ছাড়া মঙ্গিলালের তিনটি অটোরিকশা রয়েছে, যা তিনি দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া দেন। শুধু তা–ই নয়, তার মারুতি সুজুকি ব্র্যান্ডের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি আছে, যেটিও ভাড়া দেওয়া হয়।

প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রীর আবাস প্রকল্পের আওতায় মঙ্গিলালের একটি বাড়ি রয়েছে। যেখানে একটি শয়নকক্ষ, বসার ঘর ও রান্নাঘর রয়েছে। যদিও আগেই তার একাধিক সম্পত্তি ছিল।

উদ্ধার অভিযানে পরিচালনা করেছেন নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা দিনেশ মিশ্র। তিনি জানিয়েছেন, মঙ্গিলালকে উজ্জয়নের সেবাধাম আশ্রমে স্থানান্তর করা হয়েছে। তার ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি তদন্তের আওতায় রয়েছে। যেসব ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন, তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

দিনেশ মিশ্র বলেন, মঙ্গিলাল ২০২১ সাল থেকে ভিক্ষা করছেন। বর্তমানে তাকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তার সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য প্রতিবেদন আকারে প্রস্তুত করে কালেক্টরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি এক জরিপে উল্লেখ করা হয়, ইন্দোরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ভিক্ষুক রয়েছেন, যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫০০ ভিক্ষুককে বোঝানোর পর তারা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন। এক হাজার ৬০০ জনকে উদ্ধার করে পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ১৭২টি শিশুকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Gojnobi biplob

Popular Post

হামের টিকা নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারগুলো ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ভিক্ষার টাকা সুদে লাগিয়ে তিন বাড়ির মালিক, আরও আছে প্রাইভেট !

প্রকাশের সময় : ১২:৪০:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

ছবি সংগৃহিত

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের ব্যস্ত শরাফা বাজারে বেয়ারিং লাগানো একটি লোহার গাড়িতে বসে আছেন এক ব্যক্তি। তার কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো। দুই হাতে একজোড়া জুতা। হাত দিয়ে গাড়ি ঠেলে বাজারের একপাশ থেকে অন্য পাশে ঘুরছেন। আবার কখনও লোহার গাড়িতে বসে থাকেন। মানুষ তাকে দেখলে ভেবেই নিতে পারে, অসহায় এই মানুষটির পাশে দাঁড়ানো উচিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি পথচারী কারও কাছে ভিক্ষা চান না। কিন্তু তিনি এমনভাবে বসেন যাতে করে মানুষ তাকে অর্থ সহায়তা দেয়।

ব্যক্তিটির নাম মঙ্গিলাল। তিনি একজন কোটিপতি শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার তিনটি বাড়ি আছে। এর মধ্যে একটি সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া। আরও আছে একটি মারুতি সুজুকি গাড়ি ও তিনটি অটোরিকশা।

সম্প্রতি ইন্দোরে নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগের ভিক্ষুকবিরোধী অভিযানের সময় মঙ্গিলাল সম্পর্কে এ তথ্য জানা যায়। গত শনিবার গভীর রাতে অভিযানকারী দল মঙ্গিলালকে তুলে নিয়ে যায়। একজন কুষ্ঠরোগী ওই এলাকায় নিয়মিত ভিক্ষা করছেন, এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।

অভিযানকারী দল মনে করেছিল, এটি অন্যান্য সাধারণ অভিযানের মতো হবে। কিন্তু পরে তারা মঙ্গিলাল সম্পর্কে চমকপ্রদ সব তথ্য জানতে পারে।

দীর্ঘদিন মঙ্গিলাল কোনো কথা না বলেই সাহায্য চাওয়ার কৌশল আয়ত্ত করেন। তিনি কখনো সরাসরি কিছু চাইতেন না। লোহার গাড়িতে বসে থাকতেন। মানুষ তার এ অবস্থা দেখে সহানুভূতিশীল হয়ে যে যা খুশি দান করতেন। প্রতিদিন ভিক্ষা করে ৪০০ থেকে ৫০০ রুপি পেতেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গিলালের আসল ‘ব্যবসা’ শুরু হতো সন্ধ্যার পর।

জিজ্ঞাসাবাদে মঙ্গিলাল জানিয়েছেন, ভিক্ষার অর্থ তিনি খরচ করতেন না। বরং ওই অর্থ বিনিয়োগ করতেন। তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এক দিন বা এক সপ্তাহের জন্য সুদে অর্থ ধার দিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নিজেই সুদের অর্থ সংগ্রহ করতেন।

সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, তিনি প্রায় চার–পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছেন। যেখান থেকে তিনি সুদসহ দৈনিক এক থেকে দুই হাজার রুপি আয় করতেন।

ওই ব্যক্তিকে একসময় কপর্দকহীন মনে করা হতো। কিন্তু দেখা গেল, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তিনটি বাড়ির মালিক তিনি, যার মধ্যে একটি তিনতলা ভবন রয়েছে।

এ ছাড়া মঙ্গিলালের তিনটি অটোরিকশা রয়েছে, যা তিনি দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া দেন। শুধু তা–ই নয়, তার মারুতি সুজুকি ব্র্যান্ডের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি আছে, যেটিও ভাড়া দেওয়া হয়।

প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রীর আবাস প্রকল্পের আওতায় মঙ্গিলালের একটি বাড়ি রয়েছে। যেখানে একটি শয়নকক্ষ, বসার ঘর ও রান্নাঘর রয়েছে। যদিও আগেই তার একাধিক সম্পত্তি ছিল।

উদ্ধার অভিযানে পরিচালনা করেছেন নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা দিনেশ মিশ্র। তিনি জানিয়েছেন, মঙ্গিলালকে উজ্জয়নের সেবাধাম আশ্রমে স্থানান্তর করা হয়েছে। তার ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি তদন্তের আওতায় রয়েছে। যেসব ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন, তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

দিনেশ মিশ্র বলেন, মঙ্গিলাল ২০২১ সাল থেকে ভিক্ষা করছেন। বর্তমানে তাকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তার সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য প্রতিবেদন আকারে প্রস্তুত করে কালেক্টরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি এক জরিপে উল্লেখ করা হয়, ইন্দোরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ভিক্ষুক রয়েছেন, যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫০০ ভিক্ষুককে বোঝানোর পর তারা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন। এক হাজার ৬০০ জনকে উদ্ধার করে পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ১৭২টি শিশুকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।