
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এক সময় দেশের অন্যতম সেরা হাসপাতালের স্বীকৃতি পেয়েছিল। সেই সোনালি অতীত এখন কেবলই স্মৃতি। বর্তমানে চিকিৎসক সংকট, অব্যবস্থাপনা আর তদারকির অভাবে কয়েক লাখ মানুষের আস্থার এই প্রতিষ্ঠানটি এখন মৃতপ্রায়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চিকিৎসকের চেয়ারে বসে নার্সরাই দিচ্ছেন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
গত এক সপ্তাহ সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, চিকিৎসকের চেম্বারে নার্স ও মিডওয়াইফদের রাজত্ব। বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিত না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন তারা। রোগীদের প্রেসক্রিপশন লিখছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স বেলাল হোসেন, মিডওয়াইফ রুমানা, দিলরুবা ও শাকিলা। আইনের তোয়াক্কা না করে তারা রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক ও বিভিন্ন ল্যাব পরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন।
কথা হয় জ্বরে আক্রান্ত মিয়াপুর গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জ্বর নিয়ে এসেছি, তাতেই চার রকমের পরীক্ষা করতে দিয়েছে। জ্বরে আক্রান্ত আরেক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। পরে জানতে পারলাম ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন নার্স। সেবা নেওয়ার আগে বুঝতে পারি না কে চিকিৎসক আর কে নার্স।’
চারঘাট উপজেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সহসভাপতি আঞ্জুমান আরার অভিযোগ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করেই নার্সরা রোগীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার বোঝা চাপাচ্ছেন। সেই সঙ্গে রয়েছে দায়সারা সেবা।
জানা গেছে, হাসপাতালটিতে ৯ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যে ৬টি পদই দীর্ঘ দিন ধরে শূন্য। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কাগজে-কলমে থাকলেও তিনি প্রেষণে রাজশাহীতে কর্মরত। ১৮ জন চিকিৎসকের ১৭ জন নিয়োগপ্রাপ্ত থাকলেও তাদের একটি বড় অংশ কর্মস্থলে অনিয়মিত।
সোমবার সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগী আফরোজা খাতুন জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের দেখা না পেয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছেন। হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষুব্ধ রোগীরা। চারদিকে ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের কারণে চিকিৎসা নেওয়া দায় হয়ে পড়েছে।
এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রোগী ও স্বজন জানান, অনিয়ম দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে হাসপাতালটি। আরএমও থাকেন না কোয়ার্টারে, তদারকি নেই কর্মকর্তার। অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে অনেক। গত ১৪ জানুয়ারি ডায়রিয়া আক্রান্ত সাড়ে তিন বছরের শিশু রিহান আলীর মৃত্যু হয়েছে এই হাসপাতালে।
শিশুটির মা সুমাইয়া খাতুনের অভিযোগ, ‘বাচ্চার অবস্থা খারাপ হলে বারবার চিকিৎসককে ডাকলেও তিনি কক্ষ থেকে বের হননি। নার্সরাও কর্ণপাত করেননি। ভোররাতে বিনা চিকিৎসায় আমার বাচ্চাটি মারা যায়।’ এই ঘটনা হাসপাতালের গুরুতর দায়িত্বহীনতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার (আরএমও) জন্য সরকারি বাসা বরাদ্দ থাকলেও তিনি সেখানে থাকেন না। পার্শ্ববর্তী উপজেলায় নিজের ব্যক্তিগত বাড়িতে থেকে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দেরিতে অফিসে আসা এবং দ্রুত চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এমন উদাসীনতার কারণে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মিল্টন কুমার নিজের বাসায় থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘ব্যক্তিগত কারণে আমি এখানে থাকি না।’ অন্যদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তৌফিক রেজা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, চিকিৎসকরা ২৪ ঘণ্টা সেবা দিচ্ছেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস. আই. এম রাজিউল করিম এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘নার্সদের রোগীদের চিকিৎসা বা পরীক্ষা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
রাজশাহী প্রতিনিধি 








