
ছবি তালেব
২০০৬ সালের বছরের মাঝামাঝি সময়ে সন্ধ্যা ৫টার সময়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের কৈখালী স্টেশন থেকে বৈধ পাশপার্মিট নিয়ে শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের টেংরাখালী গ্রামের মৃত নেছার উদ্দীনের পুত্র আবু তালেব ও তার আপন দুই ভাই আব্দুল এবং মালেকসহ ১২ নৌকায় ১২জন জেলে এক সাথে সুন্দরবনে মাছ আহরণ করার উদ্দেশ্য রওনা দেন।
মামুন্দো নদীর “ম্যাঠ ভাঙা”র চরের খাল নামক স্থানে রাত ৮টার সময়ে পৌঁছিয়ে রাতে খাওয়া দাওয়ার পর কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে প্রায় ৩টার সময়ে এক সাথে আলাদা আলাদা কাছিতে জাল বেঁধে দেন।
ভোর ৫টার সময়ে জাল তুলে, জালের মাছ সংগ্রহ করেন এবং সকালের রান্নার করার জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে আবু তালেবসহ ১২ জেলে জঙ্গলে শুকনা কাঠ সংগ্রহ করতে থাকে। কাঠ সংগ্রহ করে একে একে নৌকাতে পৌঁছাতে থাকে। তালেব ও তার দুই ভাই একসাথে কাঠ সংগ্রহ শেষে নৌকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। প্রথম তালেবের দুই ভাই পরে তালেব।
হঠাৎ পিছু থেকে তালেবকে লক্ষ্য করে সুন্দরবনের হিংস্র বাঘ তালেবের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তালেবের ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দেয় বাঘ। দুই ভাই এই অবস্থা দেখে হাকচিৎকার করতে থাকে। তালেবকে বাঘ মুখে করে টানতে টানতে জঙ্গলের গহিনে চলে যায়। দুই ভাই চিৎকার করতে করতে বাঘের পিছু নেয়। বাঘ এই দেখে তালেবকে রেখে চলে যায়। আব্দুল ও মালেক তার ভাই তালেবকে উদ্ধার করে। তালেবের মৃত্যু হয়েছে মনে করে কাদামাটি ও রক্তাক্ত শরীর পানিতে ধুয়ে নৌকায় জাল দিয়ে ঢেকে রেখে বাড়ির পথে রওনা দেয়।
মাইল খানেক নৌকা বেঁয়ে আসার পথে তালেব দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনে তার ভাই মালেক জালটা উঁচু করে ও জীবিত নিশ্চিত করে মুখে খাওয়ার পানি দেয় এবং দ্রুত নৌকা চালাতে থাকে ৷ এমন সময় সামনে একটি ট্রলার দেখে তাদের কাছে সাহায্য চাই এবং ট্রলারে উঠিয়ে দ্রুত লোকালয়ে নিয়ে এসে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সেখানে গলার শিরা, পিঠের ক্ষত নিয়ে ৭ দিন চিকিৎসা হওয়ার পর আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা চলমান অবস্থায় তালেবকে বাড়িতে নিয়ে চলে আসে।
পরবর্তীতে তালেবের শারীরিক অবস্থা অবনতি হওয়ার কারণে তার দুই ভাই অর্থ সংগ্রহ করতে বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াতে থাকে। এর মধ্যে রমজাননগর ইউনিয়ন পরিষদের গোপাল চৌকিদারের সহযোগিতায় ঈশ্বরীপুরে খ্রিষ্টান মিশনের “ফাদার লুইস” তালেবকে খুলনার খ্রিষ্টান হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সম্পন্ন ফ্রিতে দীর্ঘ ১ মাস চিকিৎসা হওয়ার পর একটু সুস্থ হলেও তালেবের “বা” পাশ প্যারালাইসিস হয়ে যায় এবং তালেবকে রিলিজ করে বাড়িতে পাঠানো হয়। পরে তালেবের ক্ষত সারাতে শ্যামনগরের ধোনা নামক একজন নাম করা কবিরাজের চিকিৎসায় তালেবের ক্ষত সেরে উঠে, কিন্তু “বা” পাশ প্যারালাইসিস হয়ে যায়।
তালেব বাড়িতে ফেরার পর বনবিভাগ বিমা করার নামে তালেবের বিএলসি নিয়ে নেয় এবং বিমা বই-এ মাসিক ১শ টাকা জমা দেওয়ার কথা বলে। তালেবের পরিবারে ৪ মেয়ে, এক ছেলে ও প্যারালাইসিস অবস্থায় তালেবের পরিবার চালাতে তার স্ত্রী হিমশিম খেতে থাকে। এর মধ্যেও বনবিভাগের কথামতো আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশায় প্রতি মাসে ১শ টাকা করে জমা দিতে থাকে।
৫/৬ মাস টাকা জমা দেওয়ার পর সংসার চালাতে হিমশিম খেতে বিমা বইতে আর টাকা জমা দিতে পারলো না তালেবের স্ত্রী। ৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন বনবিভাগ থেকে কিছুই পেলো না, তখন তালেবের স্ত্রী কৈখালী স্টেশনে দেখা করলে বনবিভাগের সদস্যরা তাকে জানান, ২০০৯ সালে আইলা বনবিভাগের অফিস প্লাবিত হয়ে সব কিছু হারিয়ে গেছে।
আজ ১৫ বছর প্যারালাইসিস অবস্থায় তালেব শুধু মাত্র চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড ছাড়া বনবিভাগ, সরকারি, বেসরকারি কোনো সংস্থা থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা পেলো না তালেব। অভাবের তাড়নায় তালেবের স্ত্রী এনজিও থেকে লোন নিয়ে তার বাড়ির সামনে হাজার পাঁচেক টাকার মালামাল তুলে একটি খাবারের দোকান করে দিয়েছে তালেবকে। আর্থিক অসচ্ছলতা নিয়ে তালেব এখন চরম হতাশাগ্রস্ত।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি 








