ঢাকা ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের অর্থনীতি রক্ষায় তারেক রহমানে আস্থা

  • বেঙ্গল নিউজ ডেক্স
  • প্রকাশের সময় : ১২:১৬:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২১৫ বার পড়া হয়েছে

অর্থনীতির কঠিন একসময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছেন গত ১৭ বছরে নানা চড়াই-উত্রাইয়ে নিজেকে ‘শাণিত’ করা পরিণত এই রাজনীতিবিদ।

তথ্য-উপাত্ত বলছে, তিনি এমন একসময় বাংলাদেশকে সাজানোর ক্ষমতা পেয়েছেন, যখন ব্যাংক খাত লুটপাটে পথহারা। দেশ চলছে ধারদেনায়। কোষাগারে কাঙ্ক্ষিত তহবিল নেই। বড় রাজস্ব ঘাটতি। একের পর এক কারখানা বন্ধের নোটিশ। উচ্চ সুদের ছোবলে বিনিয়োগ মন্দা। স্থবির কর্মসংস্থান। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেবেন, তখন লাখো বেকার পাস করে চাকরির জন্য তীর্থের কাকের মতো ‘হাঁ’ করে বসে রয়েছেন। আর সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির তাপে পুড়ছে। ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা অবহেলিত, বঞ্চিত।

গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে নিগৃহের শিকার হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যার ফলে তাঁরা ব্যবসা-বিনিয়োগে আস্থা না পেয়ে হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘুরছে না অর্থনীতির চাকা। তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন, কবে রাজনৈতিক সরকার আসবে আর তাঁরা আস্থা পেয়ে ‘ব্যবসা-উদ্যোগে’ মনোযোগ দেবেন। মাত্র এক দিন আগেই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তাই মন্দার কবল থেকে ব্যবসা-অর্থনীতির চাকা সচল করতে সবার চোখ এখন তারেক রহমানের দিকে। সবার ধারণা, তিনি দায়িত্ব নিয়েই আগে অর্থনীতির ‘ইঞ্জিন’ চালু করতে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের আস্থায় নেবেন। তাঁদের সঙ্গে বসবেন, পরামর্শ করবেন। সব কষ্ট ভুলে দেশ পুনর্গঠনে হাত লাগাতে বলবেন। এমনই আশা ব্যবসায়ী-অর্থনীতি বিশ্লেষকদের। তাঁরা মনে করেন, তারেক রহমানকেই এখন শক্ত হাতে বিপন্ন-বিপর্যস্ত অর্থনীতির হাল ধরতে হবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনে যখন একটি নতুন সরকার গঠন হবে, তখন আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হতে হবে ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামোকে মেরামত করা।

দীর্ঘদিনের লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি আর সুশাসনের অভাব বিনিয়োগকারীদের মনে যে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি করেছে, তা দূর করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মানো জরুরি যে বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে তাঁরা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।’

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, অর্থনীতি বর্তমানে যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোই নবনির্বাচিত বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, ব্যাংক খাতের পদ্ধতিগত লুটপাট এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফলে অর্থনীতির যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তা বন্ধ করতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারকে এক যুগান্তকারী ও বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

তাঁরা আরো বলেন, অর্থনীতির এই কঠিন সন্ধিক্ষণে কেবল গত্বাঁধা সংস্কার যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ। আস্থা ফেরানোর প্রক্রিয়ায় প্রথম বড় পদক্ষেপ হওয়া উচিত ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন।

তারেক রহমান যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদার ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দিতে পারেন, তবেই ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ হবে। তারল্য সংকট কাটাতে এবং উচ্চ সুদের হারের চাপ কমাতে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সাধারণ আমানতকারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ভরসা করতে পারেন।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঘুষ-অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে চরম হতাশা। তাঁরা মনে করেন, বিনিয়োগহীনতার বৃত্ত ভাঙতে নতুন সরকারকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অদৃশ্য চাঁদাবাজি ও হয়রানি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। তারেক রহমান যদি ডিজিটাইজেশনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ‘পেপারলেস ইকোনমি’ এবং পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করতে পারেন, তবে ব্যবসা শুরুর খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে আসবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা এবং কর অবকাশ সুবিধার যৌক্তিক বিন্যাসও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হলে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন খরচ কমে আসবে, যা সরাসরি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে।

সর্বমহলে এমন আলোচনা যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত হবে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন, তবেই পণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং দাম সহনীয় পর্যায়ে আসবে। টিসিবির কার্যক্রম আরো স্বচ্ছ করা এবং সাপ্লাই চেইন থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমাতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে করের অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে করের হার না বাড়িয়ে বরং করের জাল বা ‘ট্যাক্স নেট’ বাড়ানোর পরামর্শও আছে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা মহলে।

তারেক রহমান যদি ঘোষণা দিতে পারেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে কর প্রদান করলে ব্যবসায়ীরা ভিআইপি মর্যাদা ও বিশেষ সুযোগ পাবেন, তবে কর দেওয়ার আগ্রহ বাড়বে। একই সঙ্গে মেগাপ্রজেক্টের নামে যে অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তা কঠোর তদারকির আওতায় এনে ব্যয় সংকোচননীতি গ্রহণ করলে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাঁর তারুণ্যনির্ভর নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তিনি যদি একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক মডেল’ প্রবর্তন করতে পারেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য না হয়ে মেধা ও দক্ষতা প্রাধান্য পাবে, তবে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরো উৎসাহিত হবেন। একটি জবাবদিহিমূলক সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপে বসে এবং তাঁদের বাস্তবিক সমস্যার দ্রুত সমাধান দেয়, তবে খুব দ্রুতই আস্থাহীনতার মেঘ কেটে যাবে এবং বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে যাত্রা শুরু করবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ আরো বলেন, ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিতে হবে। সবার আগে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা কেবল কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরাবে।

হুন্ডি বন্ধ করে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে বেকারত্ব,  কর্মসংস্থান,  মূল্যস্ফীতি,  জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য আর ব্যবসায়ের পরিবেশ তৈরিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

নিট পোশাক রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিকেএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা নির্বাচনের আগে তারেক রহমানকে আমাদের সমস্যার কথা জানিয়েছিলাম। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি করা, জনজীবন-ব্যবসায় মব কালচার নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সুদের হার কমানো, জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি খুবই আন্তরিক। বিএনপি এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

তিনি এখন দেশ পরিচালনা করবেন। আমি মনে করি, তিনি এখন আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবেন। অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল। কখনো আমাদের কথা শোনেনি। রপ্তানিতে আমাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেওয়া যায় কি না।

আমরাও ভারত-ইইউ চুক্তির বিপরীতে কাউন্টার চুক্তি করতে পারি কি না, আমাদের সক্ষমতা কিভাবে বাড়ানো যায় ইত্যাদি নিয়ে তিনি কাজ করতে পারেন। আমাদের কথা শুনতে পারেন। আমরা বলছি না আমাদের কথাই বাস্তবায়ন করবেন। আমরা অন্তত বলতে চাই, সিদ্ধান্ত সরকারই নিক।’

অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে অনেক সংবেদনশীল বিষয়ে চুক্তি করেছে। এসব চুক্তি রাজনৈতিক সরকার এসে করার কথা। চুক্তিগুলো কতটা দেশের স্বার্থে ইতিবাচক, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি কি না কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল হবে কি না—এখন এই প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ীরা বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা যায় কি না—সেটিও দেখার পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানকে যেসব বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ী-বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর মধ্যে রয়েছে—ডলার সাশ্রয়ে আমদানিকৃত কয়লা বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। পুঁজিবাজারে সিন্ডিকেট এবং কারসাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা। কর আদায় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা অটোমেশন করা এবং একটি ‘ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা।

রপ্তানি খাতে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পণ্যের বহুমুখীকরণ করা। তিনি যদি আইটি ও সফটওয়্যার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাতকে বিশেষ রপ্তানি সুবিধা ও প্রণোদনা প্রদান করেন, তবে রপ্তানির ঝুড়ি বড় হবে। বিশ্লেষকরা বলেন, বিএনপি সরকারকে প্রথম ১০০ দিনের জন্য ‘জরুরি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন করতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Gojnobi biplob

Popular Post

হামের টিকা নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারগুলো ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দেশের অর্থনীতি রক্ষায় তারেক রহমানে আস্থা

প্রকাশের সময় : ১২:১৬:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অর্থনীতির কঠিন একসময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছেন গত ১৭ বছরে নানা চড়াই-উত্রাইয়ে নিজেকে ‘শাণিত’ করা পরিণত এই রাজনীতিবিদ।

তথ্য-উপাত্ত বলছে, তিনি এমন একসময় বাংলাদেশকে সাজানোর ক্ষমতা পেয়েছেন, যখন ব্যাংক খাত লুটপাটে পথহারা। দেশ চলছে ধারদেনায়। কোষাগারে কাঙ্ক্ষিত তহবিল নেই। বড় রাজস্ব ঘাটতি। একের পর এক কারখানা বন্ধের নোটিশ। উচ্চ সুদের ছোবলে বিনিয়োগ মন্দা। স্থবির কর্মসংস্থান। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেবেন, তখন লাখো বেকার পাস করে চাকরির জন্য তীর্থের কাকের মতো ‘হাঁ’ করে বসে রয়েছেন। আর সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির তাপে পুড়ছে। ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা অবহেলিত, বঞ্চিত।

গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে নিগৃহের শিকার হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যার ফলে তাঁরা ব্যবসা-বিনিয়োগে আস্থা না পেয়ে হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘুরছে না অর্থনীতির চাকা। তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন, কবে রাজনৈতিক সরকার আসবে আর তাঁরা আস্থা পেয়ে ‘ব্যবসা-উদ্যোগে’ মনোযোগ দেবেন। মাত্র এক দিন আগেই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তাই মন্দার কবল থেকে ব্যবসা-অর্থনীতির চাকা সচল করতে সবার চোখ এখন তারেক রহমানের দিকে। সবার ধারণা, তিনি দায়িত্ব নিয়েই আগে অর্থনীতির ‘ইঞ্জিন’ চালু করতে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের আস্থায় নেবেন। তাঁদের সঙ্গে বসবেন, পরামর্শ করবেন। সব কষ্ট ভুলে দেশ পুনর্গঠনে হাত লাগাতে বলবেন। এমনই আশা ব্যবসায়ী-অর্থনীতি বিশ্লেষকদের। তাঁরা মনে করেন, তারেক রহমানকেই এখন শক্ত হাতে বিপন্ন-বিপর্যস্ত অর্থনীতির হাল ধরতে হবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনে যখন একটি নতুন সরকার গঠন হবে, তখন আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হতে হবে ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামোকে মেরামত করা।

দীর্ঘদিনের লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি আর সুশাসনের অভাব বিনিয়োগকারীদের মনে যে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি করেছে, তা দূর করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মানো জরুরি যে বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে তাঁরা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।’

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, অর্থনীতি বর্তমানে যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোই নবনির্বাচিত বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, ব্যাংক খাতের পদ্ধতিগত লুটপাট এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফলে অর্থনীতির যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তা বন্ধ করতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারকে এক যুগান্তকারী ও বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

তাঁরা আরো বলেন, অর্থনীতির এই কঠিন সন্ধিক্ষণে কেবল গত্বাঁধা সংস্কার যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ। আস্থা ফেরানোর প্রক্রিয়ায় প্রথম বড় পদক্ষেপ হওয়া উচিত ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন।

তারেক রহমান যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদার ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দিতে পারেন, তবেই ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ হবে। তারল্য সংকট কাটাতে এবং উচ্চ সুদের হারের চাপ কমাতে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সাধারণ আমানতকারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ভরসা করতে পারেন।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঘুষ-অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে চরম হতাশা। তাঁরা মনে করেন, বিনিয়োগহীনতার বৃত্ত ভাঙতে নতুন সরকারকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অদৃশ্য চাঁদাবাজি ও হয়রানি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। তারেক রহমান যদি ডিজিটাইজেশনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ‘পেপারলেস ইকোনমি’ এবং পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করতে পারেন, তবে ব্যবসা শুরুর খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে আসবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা এবং কর অবকাশ সুবিধার যৌক্তিক বিন্যাসও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হলে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন খরচ কমে আসবে, যা সরাসরি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে।

সর্বমহলে এমন আলোচনা যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত হবে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন, তবেই পণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং দাম সহনীয় পর্যায়ে আসবে। টিসিবির কার্যক্রম আরো স্বচ্ছ করা এবং সাপ্লাই চেইন থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমাতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে করের অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে করের হার না বাড়িয়ে বরং করের জাল বা ‘ট্যাক্স নেট’ বাড়ানোর পরামর্শও আছে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা মহলে।

তারেক রহমান যদি ঘোষণা দিতে পারেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে কর প্রদান করলে ব্যবসায়ীরা ভিআইপি মর্যাদা ও বিশেষ সুযোগ পাবেন, তবে কর দেওয়ার আগ্রহ বাড়বে। একই সঙ্গে মেগাপ্রজেক্টের নামে যে অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তা কঠোর তদারকির আওতায় এনে ব্যয় সংকোচননীতি গ্রহণ করলে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাঁর তারুণ্যনির্ভর নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তিনি যদি একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক মডেল’ প্রবর্তন করতে পারেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য না হয়ে মেধা ও দক্ষতা প্রাধান্য পাবে, তবে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আরো উৎসাহিত হবেন। একটি জবাবদিহিমূলক সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপে বসে এবং তাঁদের বাস্তবিক সমস্যার দ্রুত সমাধান দেয়, তবে খুব দ্রুতই আস্থাহীনতার মেঘ কেটে যাবে এবং বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে যাত্রা শুরু করবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ আরো বলেন, ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিতে হবে। সবার আগে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা কেবল কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরাবে।

হুন্ডি বন্ধ করে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে বেকারত্ব,  কর্মসংস্থান,  মূল্যস্ফীতি,  জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য আর ব্যবসায়ের পরিবেশ তৈরিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

নিট পোশাক রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিকেএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা নির্বাচনের আগে তারেক রহমানকে আমাদের সমস্যার কথা জানিয়েছিলাম। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি করা, জনজীবন-ব্যবসায় মব কালচার নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সুদের হার কমানো, জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি খুবই আন্তরিক। বিএনপি এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

তিনি এখন দেশ পরিচালনা করবেন। আমি মনে করি, তিনি এখন আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবেন। অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল। কখনো আমাদের কথা শোনেনি। রপ্তানিতে আমাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেওয়া যায় কি না।

আমরাও ভারত-ইইউ চুক্তির বিপরীতে কাউন্টার চুক্তি করতে পারি কি না, আমাদের সক্ষমতা কিভাবে বাড়ানো যায় ইত্যাদি নিয়ে তিনি কাজ করতে পারেন। আমাদের কথা শুনতে পারেন। আমরা বলছি না আমাদের কথাই বাস্তবায়ন করবেন। আমরা অন্তত বলতে চাই, সিদ্ধান্ত সরকারই নিক।’

অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে অনেক সংবেদনশীল বিষয়ে চুক্তি করেছে। এসব চুক্তি রাজনৈতিক সরকার এসে করার কথা। চুক্তিগুলো কতটা দেশের স্বার্থে ইতিবাচক, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি কি না কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল হবে কি না—এখন এই প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ীরা বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা যায় কি না—সেটিও দেখার পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমানকে যেসব বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ী-বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর মধ্যে রয়েছে—ডলার সাশ্রয়ে আমদানিকৃত কয়লা বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। পুঁজিবাজারে সিন্ডিকেট এবং কারসাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা। কর আদায় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা অটোমেশন করা এবং একটি ‘ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা।

রপ্তানি খাতে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পণ্যের বহুমুখীকরণ করা। তিনি যদি আইটি ও সফটওয়্যার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাতকে বিশেষ রপ্তানি সুবিধা ও প্রণোদনা প্রদান করেন, তবে রপ্তানির ঝুড়ি বড় হবে। বিশ্লেষকরা বলেন, বিএনপি সরকারকে প্রথম ১০০ দিনের জন্য ‘জরুরি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন করতে হবে।