
সমাজে যখন মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, ধর্ষণ এবং নানামুখী অপরাধ বেড়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়।
মানুষ নিরাপত্তা চায়, শান্তিতে ঘুমাতে চায়, পরিবার-পরিজন নিয়ে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে চায়। সেই বাস্তবতা থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে পুলিশ কি আগের মতো কঠোর হতে পারছে? নাকি বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কার্যকারিতা কমে গেছে?একটি প্রচলিত ধারণা হলো, একসময় পুলিশের উপস্থিতি এবং কঠোরতা অপরাধীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করত। অপরাধী জানত, আইন ভাঙলে তার দ্রুত পরিণতি ভোগ করতে হবে। ফলে অনেকেই অপরাধে জড়াতে সাহস পেত না।
বর্তমানে মানবাধিকার, আইনি প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন জবাবদিহিতার কাঠামো শক্তিশালী হওয়ার পর পুলিশের কর্মকাণ্ডও নানা নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, এর ফলে অপরাধীরা কখনো কখনো আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে। একইভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রেও অনেকে বলেন, শিক্ষকদের শাসনের ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ দুর্বল হয়েছে। যদিও শারীরিক শাস্তি কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়তে পারে এ কথাও অস্বীকার করা যায় না।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।
পুলিশের শক্তি প্রয়োজন, কিন্তু সেই শক্তি অবশ্যই আইনের কাঠামোর মধ্যে প্রয়োগ হতে হবে। কারণ সীমাহীন ক্ষমতা যেমন অপরাধ দমন করতে পারে, তেমনি অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ হলো আইন প্রয়োগ করা, প্রতিশোধ নেওয়া নয়। তাই পুলিশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।প্রকৃতপক্ষে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত, পেশাদার ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী। পুলিশ যেন অপরাধীর পরিচয়, দলীয় প্রভাব বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির চাপ বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
একই সঙ্গে পুলিশকে প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি ও আইনি সহায়তা দিতে হবে। যখন একজন পুলিশ সদস্য নিশ্চিত হবেন যে তিনি আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করলে কোনো অন্যায় চাপের মুখে পড়বেন না, তখন তার কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।আজকের বাস্তবতায় প্রশ্নটি পুলিশের হাতে লাঠি আছে কি নেই সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, পুলিশ কি সত্যিকার অর্থে আইন প্রয়োগের স্বাধীনতা পাচ্ছে? অপরাধী কি নিশ্চিতভাবে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে? এবং রাষ্ট্র কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে? একটি নিরাপদ সমাজ গড়তে আমাদের এমন পুলিশ দরকার, যারা শক্ত হাতে অপরাধ দমন করবে, কিন্তু আইনের সীমারেখা অতিক্রম করবে না। কারণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ভয় দিয়ে নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে।
আর যখন পুলিশ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও কার্যকরতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তখনই মানুষের আস্থা বাড়বে, অপরাধ কমবে এবং সমাজে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে। শাহ আলী তৌফিক রিপন
বেঙ্গল নিউজ ডেক্স 










