ঢাকা ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার্থী নেই তবুও চলছে কোটি টাকার বেতন আদায়

নেত্রকোনার শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান বিভাগের অস্তিত্ব এখন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্র দেখা গেলেও উচ্চমাধ্যমিকে উঠতেই বিজ্ঞান বিভাগে ভয়াবহ ভাটা নেমেছে। শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, ল্যাবে তালা, যন্ত্রপাতি মরিচা ধরা—তবু এমপিওভুক্ত শিক্ষক–কর্মচারীর বেতন নিয়মিতভাবেই গৃহীত হচ্ছে। শিক্ষার্থীহীন এই বিভাগে প্রতি বছর অপচয় হচ্ছে কোটি টাকার সরকারি অর্থ।

জেলা শিক্ষা অফিস ও কলেজগুলোর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সরকারি ও এমপিওভুক্ত কলেজগুলো থেকে অংশ নেবে ৬ হাজার ৮০১ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী। কিন্তু বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ৯০৮ জন যা জেলার মোট পরীক্ষার্থীর এক-ষষ্ঠাংশেরও কম।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোহনগঞ্জ শহীদ স্মৃতি কলেজে ছাত্র শূন্য, শিক্ষক ৪ জন; মোহনগঞ্জ মহিলা কলেজে ছাত্র ২, শিক্ষক ৫; মদন সরকারি আজিজ খান কলেজে ছাত্র ৭, শিক্ষক ৫; চন্দ্রনাথ কলেজে ছাত্র ৫, শিক্ষক ৫; হেনা ইসলাম কলেজে ছাত্র ৫, শিক্ষক ৪; আটপাড়া ডিগ্রি কলেজে ছাত্র ২, শিক্ষক ৫। এভাবে আরো অন্তত ১০টি কলেজে ছাত্রসংখ্যা অঙ্কের ঘরে থাকলেও শিক্ষক সংখ্যা আছে পূর্ণমাত্রায়।

ল্যাবের অবস্থা আরো নাজুক। বহু প্রতিষ্ঠানে ল্যাব তালাবদ্ধ, কোথাও যন্ত্রপাতি নষ্ট, কোথাও আবার ব্যবহার করার মতো শিক্ষক নেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের নীতিমালায় বলা হয়েছে, কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ চালাতে হলে ন্যূনতম ২০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। কিন্তু ২০২২ সালে যাচাই-বাছাই শুরু হলেও এর বাস্তবায়ন এখনো চোখে পড়েনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাধ্যমিক থেকেই ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান বৃত্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রশূন্য কলেজে শিক্ষক পুনর্বিন্যাস ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষার এই পতন ঠেকানো যাবে না।

জেলার একাধিক অধ্যক্ষ অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক তদবিরে অধিকাংশ কলেজ এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষার্থী না থাকলেও শিক্ষক কমানোর উদ্যোগ নিলেই রাজনৈতিক চাপ আসে।

নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শায়লা পারভীন শ্রাবণী জানান, মফস্বলে বিজ্ঞান শিক্ষার এই পতন চলতে থাকলে পরবর্তী দশকে দেশজুড়ে বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ঘাটতি দেখা দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হবে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, চিকিৎসা –প্রকৌশল খাত, গবেষণা ও উদ্ভাবন সবক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু তাহের খান বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে বিজ্ঞানে ছাত্রসংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ছাত্রশূন্য কলেজগুলোতে বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ করে অন্য কলেজে একীভূত করা জরুরি। এতে করে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ হবে।’

মাউশির ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক এ. কে. এম. আলিফ উল্লাহ আহসান জানান, এমপিওভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষকদের অন্য কলেজে বদলির সুযোগ নেই। ছাত্র কমে গেছে সামনে হয়ত বাড়তে পারে। আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ এবং কাম্য শিক্ষার্থী বাড়াতে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে ব্যাপারে চিঠি দেবো।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Gojnobi biplob

স্বামী বিদেশে থাকতেই অন্তঃসত্ত্বা, পরে গোপন গর্ভপাতের অভিযোগ চিকিৎসা প্রতিবেদনে ‘অসম্পূর্ণ গর্ভপাত’, এফিডেভিটের পর ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য

শিক্ষার্থী নেই তবুও চলছে কোটি টাকার বেতন আদায়

প্রকাশের সময় : ০২:১২:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
নেত্রকোনার শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান বিভাগের অস্তিত্ব এখন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্র দেখা গেলেও উচ্চমাধ্যমিকে উঠতেই বিজ্ঞান বিভাগে ভয়াবহ ভাটা নেমেছে। শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, ল্যাবে তালা, যন্ত্রপাতি মরিচা ধরা—তবু এমপিওভুক্ত শিক্ষক–কর্মচারীর বেতন নিয়মিতভাবেই গৃহীত হচ্ছে। শিক্ষার্থীহীন এই বিভাগে প্রতি বছর অপচয় হচ্ছে কোটি টাকার সরকারি অর্থ।

জেলা শিক্ষা অফিস ও কলেজগুলোর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সরকারি ও এমপিওভুক্ত কলেজগুলো থেকে অংশ নেবে ৬ হাজার ৮০১ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী। কিন্তু বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ৯০৮ জন যা জেলার মোট পরীক্ষার্থীর এক-ষষ্ঠাংশেরও কম।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোহনগঞ্জ শহীদ স্মৃতি কলেজে ছাত্র শূন্য, শিক্ষক ৪ জন; মোহনগঞ্জ মহিলা কলেজে ছাত্র ২, শিক্ষক ৫; মদন সরকারি আজিজ খান কলেজে ছাত্র ৭, শিক্ষক ৫; চন্দ্রনাথ কলেজে ছাত্র ৫, শিক্ষক ৫; হেনা ইসলাম কলেজে ছাত্র ৫, শিক্ষক ৪; আটপাড়া ডিগ্রি কলেজে ছাত্র ২, শিক্ষক ৫। এভাবে আরো অন্তত ১০টি কলেজে ছাত্রসংখ্যা অঙ্কের ঘরে থাকলেও শিক্ষক সংখ্যা আছে পূর্ণমাত্রায়।

ল্যাবের অবস্থা আরো নাজুক। বহু প্রতিষ্ঠানে ল্যাব তালাবদ্ধ, কোথাও যন্ত্রপাতি নষ্ট, কোথাও আবার ব্যবহার করার মতো শিক্ষক নেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের নীতিমালায় বলা হয়েছে, কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ চালাতে হলে ন্যূনতম ২০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। কিন্তু ২০২২ সালে যাচাই-বাছাই শুরু হলেও এর বাস্তবায়ন এখনো চোখে পড়েনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাধ্যমিক থেকেই ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান বৃত্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রশূন্য কলেজে শিক্ষক পুনর্বিন্যাস ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষার এই পতন ঠেকানো যাবে না।

জেলার একাধিক অধ্যক্ষ অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক তদবিরে অধিকাংশ কলেজ এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষার্থী না থাকলেও শিক্ষক কমানোর উদ্যোগ নিলেই রাজনৈতিক চাপ আসে।

নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শায়লা পারভীন শ্রাবণী জানান, মফস্বলে বিজ্ঞান শিক্ষার এই পতন চলতে থাকলে পরবর্তী দশকে দেশজুড়ে বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ঘাটতি দেখা দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হবে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, চিকিৎসা –প্রকৌশল খাত, গবেষণা ও উদ্ভাবন সবক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু তাহের খান বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে বিজ্ঞানে ছাত্রসংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ছাত্রশূন্য কলেজগুলোতে বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ করে অন্য কলেজে একীভূত করা জরুরি। এতে করে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ হবে।’

মাউশির ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক এ. কে. এম. আলিফ উল্লাহ আহসান জানান, এমপিওভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষকদের অন্য কলেজে বদলির সুযোগ নেই। ছাত্র কমে গেছে সামনে হয়ত বাড়তে পারে। আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ এবং কাম্য শিক্ষার্থী বাড়াতে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে ব্যাপারে চিঠি দেবো।