ঢাকা ০৩:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মায়ানমারের স্ক্যাম মাফিয়ার ১১ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিল চীনের একটি আদালত

ছবি সংগৃহিত

মায়ানমারে জালিয়াতি কেন্দ্র পরিচালনাকারী একটি কুখ্যাত পরিবারের ১১ জন সদস্যকে চীনের একটি আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই খবর বলা হয়েছে।

মিং পরিবারের বেশ কযেকজন সদস্যকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যাদের অনেককে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চীন সীমান্তসংলগ্ন মায়ানমারের ঘুমন্ত শহর লাউকাইং নিয়ন্ত্রণকারী কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে মিং পরিবার অন্যতম ছিল।

তাদের শাসনামলে একসময়ের দরিদ্র ও অবহেলিত এই অঞ্চলটি ক্যাসিনো ও রেড-লাইট এলাকার ঝলমলে কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু তাদের প্রতারণার সাম্রাজ্য ২০২৩ সালে ভেঙে পড়ে, যখন মায়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রেপ্তার করে চীনের কাছে হস্তান্তর করে।

আদালতের মতে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তাদের প্রতারণামূলক কার্যক্রম এবং জুয়ার আড্ডা থেকে ১০ বিলিয়ন ইউয়ান (১.৪ বিলিয়ন ডলার)-এরও বেশি আয় হয়েছিল। আদালত জানিয়েছেন, তাদের অপরাধের ফলে ১৪ জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারক সিসিটিভির এক প্রতিবেদন অনুসারে, সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওয়েনঝোতে মোট ৩৯ জন মিং পরিবারের সদস্যকে সাজা দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১১ জন সদস্য ছাড়াও আরো পাঁচজনকে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের পাঁচ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালত দেখতে পেয়েছেন যে, ২০১৫ সাল থেকে মিং পরিবার এবং অন্যান্য অপরাধ গোষ্ঠী টেলিযোগাযোগ জালিয়াতি, অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা, মাদক পাচার ও পতিতাবৃত্তিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।

আদালতের মতে, তাদের জুয়া ও জালিয়াতি কার্যক্রম থেকে ১০ বিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি (প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ বিলিয়ন পাউন্ড) আয় হয়েছে। এর আগে ধারণা করা হয়, চারটি পরিবারের প্রত্যেকটি ক্যাসিনো থেকেই প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার লেনদেন হতো।

আদালত আরো দেখতে পেয়েছেন যে, মিং পরিবার ও অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠী একাধিক স্ক্যাম সেন্টারের কর্মীর মৃত্যুর জন্য দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে চীনে ফিরে যাওয়া ঠেকাতে কর্মীদের গুলি করার ঘটনাও।

প্রাথমিকভাবে চীনা জুয়ার চাহিদাকে কাজে লাগানোর জন্য গড়ে তোলা হলেও লাউক্কাইংয়ের ক্যাসিনোগুলো পরে অর্থ পাচার, মানব পাচার এবং কয়েক ডজন প্রতারণা কেন্দ্র চালু হয়।জাতিসংঘ যাকে ‘কেলেঙ্কারির মহামারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

 লাউক্কাইং-এ ১ লাখেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে প্রতারণার মাধ্যমে আনা হয়েছিল, যাদের কার্যত বন্দি করে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং সারা বিশ্বের ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে জটিল অনলাইন জালিয়াতি পরিচালনা করা হতো।

মিং পরিবার একসময় মায়ানমারের শান রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী গোষ্ঠী ছিল। তারা লাউক্কাইংয়ে অন্তত ১০ হাজার কর্মী আটক রাখা একাধিক স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করত। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ‘ক্রাউচিং টাইগার ভিলা’ নামের একটি কম্পাউন্ড। যেখানে শ্রমিকদের নিয়মিত মারধর ও নির্যাতন করা হতো।

দুই বছর আগে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট আক্রমণ চালিয়ে মায়ানমারের সেনাবাহিনীকে শান রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বিতাড়িত করে এবং লাউক্কাইংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এসব গোষ্ঠীর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকা চীন ওই অভিযানে নীরব সমর্থন দিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

শাস্তি পাওয়া এই পরিবারের প্রধান মিং জুয়েচাং আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন অনুতপ্ত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

এই প্রতারণা কেন্দ্রগুলোতে কাজ করা হাজার হাজার ব্যক্তিকে চীনা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই সাজা দিয়ে চীন তার সীমান্তবর্তী এলাকায় জালিয়াতি ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।

বেইজিংয়ের চাপের মুখে থাইল্যান্ড চলতি বছরের শুরুতে মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত জালিয়াতি কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। তবে এসব পদক্ষেপের পরও এই অবৈধ ব্যবসা নতুনভাবে শুরু হয়েছে। বর্তমানে এর বড় অংশ কম্বোডিয়ায় স্থানান্তরিত হলেও মায়ানমারে এটি এখনও সক্রিয় রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Gojnobi biplob

Popular Post

হামের টিকা নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারগুলো ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মায়ানমারের স্ক্যাম মাফিয়ার ১১ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিল চীনের একটি আদালত

প্রকাশের সময় : ১১:৪২:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
ছবি সংগৃহিত

মায়ানমারে জালিয়াতি কেন্দ্র পরিচালনাকারী একটি কুখ্যাত পরিবারের ১১ জন সদস্যকে চীনের একটি আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই খবর বলা হয়েছে।

মিং পরিবারের বেশ কযেকজন সদস্যকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যাদের অনেককে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চীন সীমান্তসংলগ্ন মায়ানমারের ঘুমন্ত শহর লাউকাইং নিয়ন্ত্রণকারী কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে মিং পরিবার অন্যতম ছিল।

তাদের শাসনামলে একসময়ের দরিদ্র ও অবহেলিত এই অঞ্চলটি ক্যাসিনো ও রেড-লাইট এলাকার ঝলমলে কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু তাদের প্রতারণার সাম্রাজ্য ২০২৩ সালে ভেঙে পড়ে, যখন মায়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রেপ্তার করে চীনের কাছে হস্তান্তর করে।

আদালতের মতে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তাদের প্রতারণামূলক কার্যক্রম এবং জুয়ার আড্ডা থেকে ১০ বিলিয়ন ইউয়ান (১.৪ বিলিয়ন ডলার)-এরও বেশি আয় হয়েছিল। আদালত জানিয়েছেন, তাদের অপরাধের ফলে ১৪ জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারক সিসিটিভির এক প্রতিবেদন অনুসারে, সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওয়েনঝোতে মোট ৩৯ জন মিং পরিবারের সদস্যকে সাজা দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১১ জন সদস্য ছাড়াও আরো পাঁচজনকে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের পাঁচ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালত দেখতে পেয়েছেন যে, ২০১৫ সাল থেকে মিং পরিবার এবং অন্যান্য অপরাধ গোষ্ঠী টেলিযোগাযোগ জালিয়াতি, অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা, মাদক পাচার ও পতিতাবৃত্তিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।

আদালতের মতে, তাদের জুয়া ও জালিয়াতি কার্যক্রম থেকে ১০ বিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি (প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ বিলিয়ন পাউন্ড) আয় হয়েছে। এর আগে ধারণা করা হয়, চারটি পরিবারের প্রত্যেকটি ক্যাসিনো থেকেই প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার লেনদেন হতো।

আদালত আরো দেখতে পেয়েছেন যে, মিং পরিবার ও অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠী একাধিক স্ক্যাম সেন্টারের কর্মীর মৃত্যুর জন্য দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে চীনে ফিরে যাওয়া ঠেকাতে কর্মীদের গুলি করার ঘটনাও।

প্রাথমিকভাবে চীনা জুয়ার চাহিদাকে কাজে লাগানোর জন্য গড়ে তোলা হলেও লাউক্কাইংয়ের ক্যাসিনোগুলো পরে অর্থ পাচার, মানব পাচার এবং কয়েক ডজন প্রতারণা কেন্দ্র চালু হয়।জাতিসংঘ যাকে ‘কেলেঙ্কারির মহামারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

 লাউক্কাইং-এ ১ লাখেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে প্রতারণার মাধ্যমে আনা হয়েছিল, যাদের কার্যত বন্দি করে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং সারা বিশ্বের ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে জটিল অনলাইন জালিয়াতি পরিচালনা করা হতো।

মিং পরিবার একসময় মায়ানমারের শান রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী গোষ্ঠী ছিল। তারা লাউক্কাইংয়ে অন্তত ১০ হাজার কর্মী আটক রাখা একাধিক স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করত। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ‘ক্রাউচিং টাইগার ভিলা’ নামের একটি কম্পাউন্ড। যেখানে শ্রমিকদের নিয়মিত মারধর ও নির্যাতন করা হতো।

দুই বছর আগে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট আক্রমণ চালিয়ে মায়ানমারের সেনাবাহিনীকে শান রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বিতাড়িত করে এবং লাউক্কাইংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এসব গোষ্ঠীর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকা চীন ওই অভিযানে নীরব সমর্থন দিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

শাস্তি পাওয়া এই পরিবারের প্রধান মিং জুয়েচাং আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন অনুতপ্ত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

এই প্রতারণা কেন্দ্রগুলোতে কাজ করা হাজার হাজার ব্যক্তিকে চীনা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই সাজা দিয়ে চীন তার সীমান্তবর্তী এলাকায় জালিয়াতি ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।

বেইজিংয়ের চাপের মুখে থাইল্যান্ড চলতি বছরের শুরুতে মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত জালিয়াতি কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। তবে এসব পদক্ষেপের পরও এই অবৈধ ব্যবসা নতুনভাবে শুরু হয়েছে। বর্তমানে এর বড় অংশ কম্বোডিয়ায় স্থানান্তরিত হলেও মায়ানমারে এটি এখনও সক্রিয় রয়েছে।